Published on
:
3 min read
ইতিহাস কি শুধুই অতীতের গল্প? নাকি সময় বদলালেও ইতিহাসের কিছু ঘটনা, কিছু প্রশ্ন ঘুরেফিরে ফিরে আসে বর্তমানের দরজায়? সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘এম্পারার ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ দেখতে বসলে এই প্রশ্নই বারবার মনে আসে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন এবং তাঁর সৃষ্ট চরিত্র সব্যসাচী মল্লিককে পাশাপাশি রেখে স্বাধীনতা, প্রতিবাদ, দেশপ্রেম ও মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তুলে ধরেছে এই ছবি। দুর্গাপুজোর আবহে মুক্তি পাওয়া ছবিটি নিছক ঐতিহাসিক কাহিনি নয়, বরং বর্তমান সময়ের সঙ্গে অতীতের মিল খুঁজে দেখার একটি আন্তরিক প্রয়াস। ছবির অন্যতম আকর্ষণ শরৎচন্দ্রের বাস্তব জীবন এবং তাঁর উপন্যাস ‘পথের দাবী’র বিপ্লবী চরিত্র সব্যসাচী মল্লিকের কাহিনিকে সমান্তরাল পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
একদিকে কলমকে হাতিয়ার করে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নিজের বক্তব্য তুলে ধরছেন শরৎচন্দ্র, অন্যদিকে সব্যসাচী সরাসরি সংগ্রামের পথ বেছে নিচ্ছে। প্রতিবাদের এই দুই ভিন্ন ভাষা ছবির মূল সুর তৈরি করেছে। টোটা রায়চৌধুরী শরৎচন্দ্রের চরিত্রে সংযত অভিনয় করেছেন। তাঁর চোখেমুখে লেখকের ক্ষোভ, চিন্তা ও সময়কে বোঝার চেষ্টা ধরা পড়ে। অন্যদিকে, আবির চট্টোপাধ্যায়ের সব্যসাচী আত্মবিশ্বাসী, বুদ্ধিদীপ্ত এবং একই সঙ্গে দৃঢ়চেতা। তাঁর উপস্থিতিতে চরিত্রটির ব্যক্তিত্ব ও বিপ্লবী মানসিকতা যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। দু’জনের অভিনয়ই ছবির গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। ছবিতে ‘নায়ক’ শব্দটির অর্থ নতুন করে ভাবার সুযোগ রয়েছে। নায়ক মানেই যে পেশিবহুল শরীর, অসাধারণ ক্ষমতা কিংবা চোখধাঁধানো বীরত্ব, তা নয়। কখনও কলম হাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষও নায়ক, আবার কখনও নিজের জীবন বিপন্ন করে প্রতিবাদে সামিল হওয়া মানুষও নায়ক।
সব্যসাচী সেই দ্বিতীয় ধরনের নায়ক, যিনি মানুষকে একজোট করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের স্বপ্ন দেখায়। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপস্থিতিও তাৎপর্যপূর্ণ। শরৎচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং জাতীয়তাবাদ নিয়ে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ছবিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দেশপ্রেমের অর্থ কী, স্বাধীনতার লড়াইয়ে কোন পথ বেছে নেওয়া উচিত—এই প্রশ্নগুলি গল্পের ভিতকে আরও শক্তিশালী করেছে। টোটা ও আবিরের পাশাপাশি মিমি চক্রবর্তী এবং দিব্যাণী মণ্ডলও নজর কাড়েন। তাঁদের চরিত্রের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগের দিকটি উঠে এসেছে। কাঞ্চন মল্লিকের অভিনয়ে রয়েছে পরিচিত স্বাদ, যা গল্পের গাম্ভীর্যের মধ্যেও কিছুটা স্বস্তি আনে। তথাগত মুখোপাধ্যায়, দেবপ্রিয় মুখোপাধ্যায় এবং ঋক চট্টোপাধ্যায়ও নিজেদের মতো করে ছবির বুননে অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে দেবপ্রিয়র অভিনয় বেশ উপভোগ্য। সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচিত সময়ের বাইরে গিয়ে গল্প বলার কৌশল ব্যবহার করেছেন। শরৎচন্দ্রের জীবন এবং সব্যসাচীর কাহিনি বারবার পাশাপাশি এগিয়েছে। দুই চরিত্রের সরাসরি দেখা না হলেও তাঁদের ভাবনা ও অভিজ্ঞতা একে অন্যকে সম্পূর্ণ করে।
প্রথমদিকে একাধিক চরিত্রের দ্রুত পরিচয় কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তবে গল্প এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে সেই জট অনেকটাই কাটে। দেবদাস-সংক্রান্ত অংশটি অবশ্য মূল কাহিনির তুলনায় সামান্য অতিরিক্ত মনে হয়। ছবির আবহসঙ্গীত কাহিনির আবেগকে আরও গভীর করেছে। ‘তোমারে করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা’ গানটির ব্যবহার বিশেষ ভাবে মনে থাকে। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, বিপ্লবের উত্তেজনা এবং চরিত্রগুলির মানসিক টানাপড়েনকে সঙ্গীত যথাযথ ভাবে সঙ্গত দিয়েছে। সৃজিতের সঙ্গীত পরিচালনার এই নতুন দিক ছবির অন্যতম ইতিবাচক সংযোজন। সব মিলিয়ে, ‘এম্পারার ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ নিখুঁত ছবি না হলেও এর বক্তব্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বর্তমান সমাজে প্রতিবাদের জায়গা, মতপার্থক্য মেনে নেওয়া এবং স্বাধীন ভাবে ভাবার অধিকারের মতো বিষয়গুলি ছবিটি সামনে আনে।
কোথাও কোথাও গল্পের গতি আরও মসৃণ হতে পারত, তবে সেই সামান্য খামতি ছবির মূল বক্তব্যকে আড়াল করতে পারে না। যাঁরা বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস এবং রাজনৈতিক ভাবনানির্ভর সিনেমা পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য ছবিটি অবশ্যই দেখার মতো। কারণ, সময় পাল্টালেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রয়োজন কখনও ফুরিয়ে যায় না। আর সেই লড়াইয়ে কখনও কলম, কখনও প্রতিবাদী কণ্ঠ, কখনও বা সব্যসাচীর মতো দৃঢ়চেতা মানুষের প্রয়োজন হয়।
