ফুটবলের মাঠের বাইরের লড়াই এবার আরও উত্তপ্ত। একদিকে বিশ্বকাপের বিপুল অর্থের পরিকল্পনা, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফিফার শান্তি পুরস্কার দেওয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড বাতিল-বিতর্কিত একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিফার কাছে জবাব চেয়েছে উয়েফা। সব মিলিয়ে প্রশ্নের সংখ্যা ৪২। শুধু ব্যাখ্যা নয়, প্রতিটি প্রশ্নের লিখিত উত্তর ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও চায় ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এ জন্য ফিফাকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে আগামী ২ নভেম্বর পর্যন্ত!
ফিফার মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রমকে গত ১৯ অক্টোবর পাঠানো এক চিঠিতে এসব প্রশ্ন তুলে ধরেন উয়েফার সাধারণ সম্পাদক থিওডোর থিওডোরিদিস। চিঠিটি দেখেছে সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন ও দ্য অ্যাথলেটিক। এতে ফিফার শাসনব্যবস্থা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
উয়েফার অসন্তোষের কেন্দ্রে রয়েছে ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) নামের একটি বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা। ফিফার বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও ইভেন্ট পরিচালনাসংক্রান্ত ব্যবসার ২০ শতাংশ অংশীদারত্ব বিক্রি করে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রাইভেট ইক্যুইটি প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটালের সঙ্গে আলোচনাও এগিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে রয়েছেন জশ কুশনার, যিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই।
বিতর্কের মূল জায়গা ছিল সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। ফিফা কাউন্সিলের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা ছাড়াই কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে এমন একচেটিয়া অধিকার দেওয়া হলো, সেটিই জানতে চায় উয়েফা। পরিকল্পনাটি প্রথম কার মাধ্যমে এবং কখন উত্থাপিত হয়েছিল, থ্রাইভ ক্যাপিটালকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন-এমন প্রশ্নও রয়েছে চিঠিতে।
উয়েফার আপত্তি এতটাই তীব্র ছিল যে, একপর্যায়ে ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতা বয়কটের হুমকিও দিয়েছিল সংস্থাটি। পরে এফএফই পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে ফিফার আশ্বাস পাওয়ার পর সেই অবস্থান থেকে সরে আসে তারা। কিন্তু পরিকল্পনা বাতিল হলেই বিতর্ক শেষ হয়ে যায়নি। উয়েফার প্রশ্ন, যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটির পেছনের প্রক্রিয়া ও দায়বদ্ধতার ব্যাখ্যা কোথায়?
এখানেই শেষ নয়। ফিফার শান্তি পুরস্কার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে উয়েফা। সম্প্রতি প্রবর্তিত এই পুরস্কার কেন এবং কী প্রক্রিয়ায় চালু করা হলো, তাতে ইনফান্তিনোর ভূমিকা কতটা ছিল, আর ট্রাম্পকেই বা কোন মানদণ্ডে নির্বাচিত করা হলো-এসবের উত্তর চায় সংস্থাটি। পুরস্কারপ্রাপক নির্বাচনে কোনো স্বাধীন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তার প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও চাওয়া হয়েছে!
যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড বালোগানের লাল কার্ড বাতিলের ঘটনাও বাদ যায়নি প্রশ্নের তালিকা থেকে। ২০২৬ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয়েছিল। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটিতে মাঠে নামার সুযোগ পান তিনি। শেষ পর্যন্ত ওই ম্যাচে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, সেটিই এখন উয়েফার প্রশ্ন। বিশেষ করে ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে এ বিষয়ে ইনফান্তিনো কী কথা বলেছিলেন, তা জানতে চেয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্বকাপে তারকা ও বিশেষ অতিথিদের জন্য ফিফার বিশেষ আতিথেয়তার ব্যবস্থাও নজর এড়ায়নি উয়েফার। বিশেষ কক্ষ বা সুবিধা বিনা মূল্যে দেওয়া হয়েছিল কি না, কারা এসব সুবিধা পেয়েছেন এবং এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কীভাবে হয়েছে, তা নিয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
গত ১৫ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফা কাউন্সিলের সভায় ইনফান্তিনো সদস্যদের লিখিতভাবে প্রশ্ন জমা দিতে বলেছিলেন। ডিসেম্বরের পরবর্তী সভায় এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু উয়েফা সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি নয়। তাদের বক্তব্য, ভবিষ্যতে প্রশাসনিক সংস্কারের আশ্বাস দিয়ে অতীতের সিদ্ধান্তগুলোর জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কাউন্সিলের পরবর্তী সভা পর্যন্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর ঝুলিয়ে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়।
এই টানাপোড়েনের মধ্যে ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়েও বাড়ছে আলোচনা। ২০২৭ সালের মার্চে আবার ফিফা সভাপতি নির্বাচনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তবে তার পদত্যাগের দাবিও উঠেছে ফুটবলের প্রভাবশালী মহলে। উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন ও কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্তালিয়ানিসসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তার নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ফিফার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেবি হিউইটও ইনফান্তিনোর সরে দাঁড়ানোর পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তবে ২১১ সদস্যের ফিফায় ইনফান্তিনোর সমর্থকও কম নয়। এখন পর্যন্ত পরবর্তী সভাপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শুধু তিনিই। প্রার্থিতা ঘোষণার শেষ সময় ১৮ নভেম্বর।
উয়েফার ৪২টি প্রশ্ন কেবল কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চাওয়ার বিষয় নয়, বরং ফিফার ক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। ২ নভেম্বরের মধ্যে ফিফা কী জবাব দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ মাঠের ফুটবল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বিশ্বের সর্বোচ্চ সংস্থাটির নিজের সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়েই এবার বড় পরীক্ষা।
