ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মধ্যে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের। ৪১ বছর বয়সী যুবরাজকে কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে বাংকার সুবিধাসম্পন্ন বিভিন্ন রাজপ্রাসাদে পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বড় ধরনের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। গত এক দশকে সৌদি আরবে এটিকে সবচেয়ে বড় ও রক্তক্ষয়ী হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। রিয়াদের ‘মক্কা চুক্তি’র মিত্ররাও সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
গত মঙ্গলবার একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হুতিদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হওয়ায় তাঁকে জনসম্মুখ থেকে দূরে রেখে বিশেষভাবে বাছাই করা নিরাপত্তা দলের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। হুতিদের এক মুখপাত্র রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করে জানিয়েছেন, সৌদি বিমানবন্দরগুলোতে হামলা অব্যাহত থাকবে। গত পাঁচ দিনে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চারবার হামলা চালানো হয়েছে। গত সপ্তাহান্তের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর বিমানবন্দরটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
উড়োজাহাজ চলাচলবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সিরিয়াম’-এর তথ্য অনুযায়ী, অচলাবস্থার কারণে রিয়াদ বিমানবন্দরের নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৬০ শতাংশ বাতিল করতে হচ্ছে।
সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান বলেছেন, হামলার মাত্রা বিবেচনায় সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়াও সমপর্যায়ের কঠোর হবে। তবে দেশটির কর্মকর্তারা গোপনে স্বীকার করেছেন, একের পর এক হামলা ঠেকাতে গিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত মাসে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও কমে এসেছে।
দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর ২০২২ সালে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। কিন্তু গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হলে সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে। হুতিদের অভিযোগ, সানা বিমানবন্দর থেকে তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে তেহরানগামী একটি ইরানি উড়োজাহাজ উড্ডয়নের চেষ্টা করলে সৌদি বাহিনী গুলি চালায়। এরপর থেকেই নতুন করে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আরব উপদ্বীপে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, এ সংঘাতের ফলে শুধু ‘ইসরায়েল সরকারই লাভবান হবে’। উত্তেজনা কমাতে গত রোববার রাতে সৌদি আরব ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দীর্ঘ ফোনালাপ হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রাজনৈতিক সমাধান এড়িয়ে শুধু সামরিক পথে এগোনোর বিষয়ে রিয়াদকে সতর্ক করেন এবং সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংলাপ শুরু করতে তেহরান সহযোগিতা করবে বলে জানান।
২০১৫ সালে ইয়েমেন সরকারের পক্ষে সৌদি আরব সরাসরি গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার পর থেকেই হুতিদের সঙ্গে রিয়াদের দীর্ঘ সংঘাতের সূচনা হয়।
