নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রামে যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১৪ জনের মধ্যে রয়েছেন শরীয়তপুরের জাজিরার পাঁচ ব্যবসায়ী। তাঁরা কৃষিপণ্য কিনতে নাটোর যাচ্ছিলেন। আজ মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে মহাসড়কের সরকারপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের ডুবিসায়বর এলাকার ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (৩০), রামকৃষ্ণপুর মাদবরকান্দি এলাকার জহির উদ্দিন মাদবরের ছেলে জুয়েল মাদবর (৩২), ডুবিসায়বর মোল্যাকান্দি এলাকার জাহান উদ্দিন মোল্যার ছেলে শাহনাল মোল্যা (৪৫), আরব আলী ফকিরের ছেলে সামাদ ফকির (৬৫) এবং পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার রাজ্জাক বেপারীর ছেলে শাহিন বেপারী (৩০)।
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ফয়সাল ফকির (৩০) নামে একজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নিহত পাঁচজন দীর্ঘদিন ধরে জাজিরার কাজিরহাট বাজারে যৌথ ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও ভুসিমাল কিনতে সোমবার সন্ধ্যায় তাঁরা নাটোরের উদ্দেশে রওনা হন। কেনা পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল তাঁদের।
জুয়েল মাদবর ভুসিমালের পাশাপাশি কাজিরহাট বাজারে রড-সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। সামাদ ফকির ভুসিমালের ব্যবসা করতেন। শাহিন বেপারী হলুদ কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শাহনাল মোল্যা ও সোহাগ শিকদার নানা ধরনের কৃষিপণ্য কেনাবেচা করতেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মঙ্গলবার দুপুরে সোহাগ শিকদারের বাড়ির সামনে যেতেই শোনা যায় তাঁর মায়ের বিলাপ, ‘আল্লাহ আমারে নিলানা কেন? আমার ছেলেরে কেন নিয়া গেলা?’
সোহাগের বাবা ইউনুস শিকদার বলেন, ‘পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল সে। কয়েকজনের সঙ্গে মিলে সোহাগ পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা, ধনিয়াসহ মৌসুমি পণ্যের ব্যবসা করত। গতকাল সন্ধ্যায় তারা পেঁয়াজ কেনার জন্য নাটোরে যায়। আর আজ সকাল ৮টার দিকে ওই এলাকার থানার ওসি ফোন করে দুর্ঘটনার খবর জানান। সোহাগের দুই বছরের ছেলেটা বাবার আদর কি, বুঝলই না।’

শাহনাল মোল্যার বাড়িতেও ছিল আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। তাঁর স্ত্রী বিউটি বেগম ছেলেমেয়েদের জড়িয়ে ধরে আহাজারি করছিলেন।
শাহনাল মোল্যার বড় ভাইয়ের স্ত্রী নাছিমা বেগম বলেন, ‘গতকাল শাহনালসহ কয়েকজন একসঙ্গে মালামাল কিনতে নাটোরে যায়। আজ সকালে এক দারোগা ফোন করে দুর্ঘটনায় শাহনালের মৃত্যুর খবর জানান। তাঁর স্ত্রী, পাঁচ মেয়ে ও দুই ছেলে রয়েছে।’
জুয়েল মাদবরের বড় ভাই শাহজাহান মাদবর বলেন, ‘গতকাল রাতে জুয়েল আমাকে ফোন দিয়ে বলেছিল, ভুট্টা কিনতে নাটোর যাবে। আর সকালেই জানলাম, আমার ভাই নাটোরে মারা গেছে। এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।’
কাজিরহাট বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, নিহত পাঁচজনের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক ছিল। তাঁরা একসঙ্গে ব্যবসা করতেন এবং বিভিন্ন পণ্য কিনতে প্রায়ই একসঙ্গে যাতায়াত করতেন। তাঁদের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার-পরিজনের পাশাপাশি সহকর্মী, বন্ধু ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও শোকাহত।
কাজীরহাট বণিক সমিতির সভাপতি মোকলেছুর রহমান মাদবর বলেন, ‘কাজীরহাট বাজারের পাঁচ ব্যবসায়ীর মরদেহ নিয়ে আসা হচ্ছে। এ ঘটনায় আমরা সবাই শোকাহত। তাঁদের শোকে আছরের নামাজের পর থেকে মাগরিবের নামাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাজারের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। রাত ৯টায় কাজীরহাট বাজারে একসঙ্গে পাঁচজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।’
জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সালেহ আহম্মেদ বলেন, দুর্ঘটনায় জাজিরার পাঁচজনের মৃত্যুর বিষয়টি তাঁরা জানতে পেরেছেন। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। মরদেহগুলো জাজিরায় নিয়ে আসা হচ্ছে বলেও জানা গেছে। এ ঘটনায় থানার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
