নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষের একটাই আশা থাকে- কখন নদী শান্ত হবে, কখন বন্ধ হয়ে আসবে ভাঙন, আর কবে জেগে উঠবে হারানো সেই চর। কিন্তু ভোলার উপকূলীয় জনপদে সেই চিরচেনা বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর বুকে যখনই নতুন চর জেগে ওঠে, তখনই ভাগ্য খোলে একশ্রেণির প্রভাবশালী চক্রের। অথচ নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া প্রকৃত জমির মালিকরা মুখোমুখি হন চরম ষড়যন্ত্রের। ক্ষমতা ও দখলের রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত কোণঠাসা হয়ে পড়েন ভিটেমাটি হারানো অসহায় মানুষগুলো।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সরকারদলীয় ছায়ায় একটি প্রভাবশালী চক্র রাতারাতি এসব চরের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়। ক্ষমতা আর প্রভাব বিস্তার করে তারা চরগুলোতে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করে চলেছে। রাজাপুরের ‘ভোলারচর’, কাচিয়ার ‘মাঝেরচর’ কিংবা মদনপুরের ‘বৈরাগীচর’-ভোলার এমন অসংখ্য চরে এখন চলছে তাদেরই অঘোষিত শাসন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই দখলদার চক্রের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি। একসময় যারা সাধারণ জেলে, দিনমজুর কিংবা নদীর জলদস্যু হিসেবে পরিচিত ছিলেন, চরের জমি দখল ও চাঁদাবাজির অবৈধ টাকায় তারা আজ একেকজন অঢেল সম্পদের মালিক। লাঠিয়াল বাহিনী ও অবৈধ অস্ত্রের শক্তিতে আজ তারা রীতিমতো ‘চর-দানবে’ পরিণত হয়েছেন।
চর দখল, চরের চাষিদের কাছ থেকে জোরপূর্বক খাজনা আদায়, অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাছের ঘের তৈরি এবং চরের জমি কেনাবেচার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়াই তাদের প্রধান ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ফলে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন দখলদারেরা, আর বহু বছরের ভিটেমাটি হারিয়ে প্রকৃত জমির মালিকরা বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন বেড়িবাঁধে বা রাস্তার পাশে।
অথচ বহু চরের প্রকৃত জমির মালিকদের কাছে এখনো রয়েছে শত বছরের পুরোনো সিএস কিংবা এসএ খতিয়ান। কিন্তু নদী থেকে নতুন চর জাগলে জমি জরিপ ও সীমানা নির্ধারণের আইনি জটিলতাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায় এই দখলদার চক্র। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কেবল লাঠিয়াল বাহিনীর ভয়ে নিজেদের পৈতৃক জমিতে পা পর্যন্ত রাখতে পারেন না প্রকৃত মালিকরা।
নিঃস্ব হওয়া ভুক্তভোগী জমির মালিক বাবুল হাওলাদার আকুতি জানিয়ে বলেন, নদী আমাদের সব কেড়ে নিয়েছিল। ভেবেছিলাম, নদী যখন চর ফিরিয়ে দিল, এবার বুঝি একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পাব। কিন্তু জমি জেগে ওঠার পর জোর করে তা দখল করে নেয় ওই প্রভাবশালীরা। আমাদের পৈতৃক জমি আছে, খতিয়ান আছে, কিন্তু গায়ের জোর আর ক্ষমতার কাছে আমরা জিম্মি।
উপকূলীয় এলাকার এই দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, ভোলার নতুন ও পুরোনো চরগুলোতে অতি দ্রুত সঠিক ও নিরপেক্ষ যৌথ জরিপ চালাতে হবে। জরিপ শেষে প্রকৃত ভূমিহীন ও নদীভাঙনের শিকার মানুষের মধ্যে ন্যায্য জমি বণ্টন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
তবে প্রকৃত মালিকরা তাদের জমি বুঝে পাবেন, কোনো দখলদারত্ব চলবে না বলে জানিয়েছেন ভোলা সদর আসনের সংসদ সদস্য ও তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ।
