১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:১৫ পিএম
একটি রাষ্ট্র কতখানি সভ্য, তার প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় ক্ষমতাবানদের নিরাপত্তায় নয়, বরং তার সবচেয়ে অসহায় শিশুটির নিরাপত্তায়। যে দেশে শিশুর শৈশব প্রতিনিয়ত ধর্ষণ, নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, ডিজিটাল নিপীড়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার কাছে পরাজিত হয়, সেখানে উন্নয়নের বর্ণাঢ্য পরিসংখ্যানও মানবিক ব্যর্থতার নির্মম সত্যকে আড়াল করতে পারে না।
শিশু সুরক্ষা তাই অনুকম্পার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অপরিহার্য পরীক্ষা।
বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তিত হয়, ক্ষমতার বিন্যাস বদলায়, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অভিধান নতুন শব্দে সজ্জিত হয়; কিন্তু শিশুদের নিরাপত্তাহীনতার দীর্ঘ ইতিহাসে প্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটে না। প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদলের পর আমরা শুনি রাষ্ট্র সংস্কারের উচ্চকিত ঘোষণা, ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার, বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন। অথচ সেই রাষ্ট্রেরই কোনো প্রত্যন্ত জনপদে একটি শিশুকন্যা যৌন সহিংসতার শিকার হয়, কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, কোনো পরিবারে দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক চাপের কারণে বাল্যবিবাহের আয়োজন চলে।
ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হলেও তাদের অন্তর্নিহিত সূত্র অভিন্ন, রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা, সামাজিক ক্ষমতাবৈষম্য এবং অপরাধ প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা।
ইউনিসেফের ‘চাইল্ড প্রোটেকশন স্ট্র্যাটেজি ২০২১–২০৩০’ অনুযায়ী, শিশু সুরক্ষার অর্থ শিশুদের প্রতি শোষণ, নির্যাতন, অবহেলা, ক্ষতিকর প্রথা ও সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সংঘটিত অপরাধের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা। অর্থাৎ কোনো শিশুকে বিপদ থেকে উদ্ধার করাই সুরক্ষার সমাপ্তি নয়; বরং তাকে পুনরায় বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্ত রাখা, মানসিক পুনর্বাসন, নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের প্রচলিত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় উদ্ধার অভিযানের দৃশ্যমান সাফল্য যতখানি গুরুত্ব পায়, উদ্ধার-পরবর্তী সুরক্ষার অদৃশ্য অথচ অপরিহার্য দায়িত্ব ততখানি গুরুত্ব পায় না।
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-ভিত্তিক ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শূন্য থেকে সতেরো বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৬৯ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। সংখ্যাটি কেবল জনমিতিক পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ। অথচ রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের আলোচনায় শিশুদের জন্য স্বতন্ত্র সুরক্ষা বরাদ্দ, প্রশিক্ষিত সমাজকর্মী, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কার্যকর বিচারিক সহায়তার প্রশ্ন যথাযথ গুরুত্ব পায় না। যে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকে গৌণ বিবেচনা করে, সে রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে নিজের ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চয়তার কাছে সমর্পণ করে।
সাম্প্রতিক জাতীয় পরিসংখ্যান আমাদের এই উদ্বেগকে আরো গভীর করে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, এক থেকে চৌদ্দ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ জরিপের পূর্ববর্তী এক মাসে সহিংস শাসন বা শাস্তির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। পাঁচ থেকে সতেরো বছর বয়সী শিশুদের ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুশ্রমে নিয়োজিত। অন্যদিকে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। এসব পরিসংখ্যান একটি অস্বস্তিকর সত্য উন্মোচন করে, শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা যে পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর, সেখানেও সহিংসতা এবং অধিকারবঞ্চনার বিস্তৃত উপস্থিতি রয়েছে।
কন্যাশিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরো জটিল হয়ে উঠেছে ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্প্রসারণে। একসময় শিশুর নিরাপত্তাহীনতার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে পরিবার, বিদ্যালয় কিংবা জনপরিসরকে চিহ্নিত করা হতো। এখন স্মার্টফোনের পর্দাও অপরাধ সংঘটনের একটি ক্ষেত্র। ডিজিটাল যোগাযোগের সুযোগকে ব্যবহার করে অপরাধীরা শিশুর বিশ্বাস অর্জন, আবেগগত নির্ভরশীলতা সৃষ্টি, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং অন্তরঙ্গ ছবি প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইলের মতো অপরাধ সংঘটিত করতে পারে। প্রযুক্তি নিজে অপরাধী নয়; অপরাধী সেই মানুষ এবং সেই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা, যেখানে শিশুর অনভিজ্ঞতা শোষণের সুযোগে পরিণত হয়।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউনিসেফ বাংলাদেশ ১১ বছর বয়সী এক শিশুকন্যার ঘটনা প্রকাশ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে যোগাযোগের পর শিশুটি নিখোঁজ হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে উত্তরবঙ্গের একটি জেলা থেকে উদ্ধার হয়। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, উদ্ধারের পরও শিশুটির পরিচয় ও গোপনীয়তা যথাযথভাবে সুরক্ষিত হয়নি। তার সাক্ষাৎকারের ভিডিও প্রচার এবং গণমাধ্যমের একাংশে অভিযুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে শিশুটির ‘প্রেমিক’ হিসেবে উপস্থাপনের সমালোচনা করে ইউনিসেফ। এখানে প্রশ্নটি শুধু অপরাধীর নয়; প্রশ্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের দায়িত্ববোধ নিয়েও। ১১ বছরের একটি শিশুকে প্রাপ্তবয়স্কের সম্পর্কের ধারণায় বিচার করা নিছক ভাষাগত অসতর্কতা নয়, বরং শিশুর অসহায়ত্বকে আড়াল করার বিপজ্জনক প্রবণতা।
২০২৫ সালে বিএমজে ওপেন সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশের একটি গবেষণা এই সংকটের গভীরতা নির্দেশ করে। চারটি বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির ৪৫৬ শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় প্রায় ৫৩ শতাংশ শিক্ষার্থী জীবনের কোনো পর্যায়ে অনলাইন যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। গবেষণায় শহুরে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি পাওয়া যায়। অনলাইন গ্রুমিং, অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আধেয়
প্রদর্শন এবং যৌন উদ্দেশ্যে ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনাও উঠে আসে। অবশ্য সীমিতসংখ্যক বিদ্যালয়ের এই গবেষণাকে সমগ্র বাংলাদেশের শিশুদের প্রতিনিধিত্বশীল চিত্র বলে উপস্থাপন করা বৈজ্ঞানিকভাবে সমীচীন নয়। কিন্তু এর সতর্কসংকেত উপেক্ষা করারও কোনো যুক্তি নেই।
এখানে একটি প্রচলিত সামাজিক ধারণা সংশোধন করা জরুরি। আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তান মানেই অধিকতর নিরাপদ শিশু নয়। ভালো বিদ্যালয়, দামি স্মার্টফোন কিংবা নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ শিশুকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপত্তা দেয় না। বরং অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল উপস্থিতি, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ এবং অভিভাবকের সঙ্গে আস্থাপূর্ণ যোগাযোগের অভাব থাকলে সচ্ছল পরিবারের শিশুও বিপন্ন হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ঝুঁকি কম। তাদের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত বঞ্চনার পাশাপাশি শিশুশ্রম, পাচার, বাল্যবিবাহ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব ভিন্নমাত্রার বিপদ সৃষ্টি করে। শিশুর নিরাপত্তা তাই শ্রেণিগত প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; প্রত্যেক শিশুর স্বতন্ত্র ঝুঁকি শনাক্ত করার প্রশ্ন।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের ২০২৫ সালের ইউ-রিপোর্ট জরিপে প্রায় ২৯ হাজার শিশু ও তরুণ অংশগ্রহণ করে। সেখানে প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় দুজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ভুয়া সংবাদ ও ভুল তথ্যকে মানসিক চাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে। আবার ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা অনলাইন বুলিং ও বিদ্বেষমূলক আচরণ প্রতিরোধে কার্যকর নিয়মের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে। এই অভিমত স্পষ্ট করে, ডিজিটাল স্বাধীনতার সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো অযৌক্তিক। শিশুর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে প্রথমেই তাকে ভয়, প্রতারণা ও নিপীড়নের পরিবেশ থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
শিশুবিবাহ প্রতিরোধের আইনগত কাঠামোতেও কিছু উদ্বেগজনক অসংগতি রয়েছে। ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭’-এর ১০ ধারায় নির্দিষ্ট শর্তে বাল্যবিবাহের উদ্যোগে জড়িত, কিন্তু বিবাহ সম্পন্ন করেননি, এমন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মুচলেকা বা বন্ডের ভিত্তিতে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। আইনি বিধানটির উদ্দেশ্য প্রতিরোধমূলক হলেও এর প্রয়োগে শিশুর নিরাপত্তা উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো কন্যাশিশুকে বাল্যবিবাহের আয়োজন থেকে উদ্ধার করে আবার একই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া হলে রাষ্ট্র কীভাবে নিশ্চিত করবে যে পরবর্তী সময়ে গোপনে তার বিবাহ সম্পন্ন হবে না, মুচলেকার কাগজ কি শিশুর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হতে পারে, আইনকে তাই কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ঝুঁকি মূল্যায়ন, পারিবারিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
শিশু ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রেও বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। অপরাধ সংঘটনের পর প্রবল জনরোষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় এবং প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা গেলেও মামলা নিষ্পত্তি, সাক্ষীর নিরাপত্তা, ফরেনসিক সক্ষমতা ও ভুক্তভোগীর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের প্রশ্ন প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। শুধু শাস্তির কঠোরতা বৃদ্ধি করলেই অপরাধ প্রতিরোধ নিশ্চিত হয় না; অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনানুগ বিচারের বাস্তব নিশ্চয়তা অপরিহার্য। অপরাধী যখন প্রভাবশালী, তখন শিশুর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। এই অসম ক্ষমতাসম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
এখানে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। শিশু নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশ অবশ্যই জনস্বার্থের অংশ। কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের নামে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ, ব্যক্তিগত বিবরণের অপ্রয়োজনীয় বিস্তার কিংবা সংবেদনশীল ঘটনার চাঞ্চল্যকর উপস্থাপন শিশুটির ওপর দ্বিতীয়বার আঘাত হানতে পারে। সংবাদমাধ্যমের কাজ শিশুর অসহায়ত্বকে প্রদর্শনীর উপকরণে পরিণত করা নয়; অপরাধের কাঠামোগত কারণ উন্মোচন, প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শিশুর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা।
রাষ্ট্রের করণীয়ও অস্পষ্ট নয়। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় প্রশিক্ষিত শিশুসুরক্ষা সমাজকর্মী নিয়োগ, বিদ্যালয়ভিত্তিক গোপন অভিযোগ গ্রহণব্যবস্থা, শিশু উপযোগী তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া, বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং উদ্ধার-পরবর্তী নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা পাঠ্যক্রমে বয়সোপযোগী ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সম্মতি, ডিজিটাল সচেতনতা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে সাহায্য চাওয়ার পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শিশু-নিরাপত্তাবিষয়ক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং শিশুর ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন স্বতন্ত্র অর্থবরাদ্দ, পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা এবং নিয়মিত প্রকাশ্য অগ্রগতি প্রতিবেদন।
নবগঠিত সরকারের প্রতি তাই আমাদের প্রত্যাশা, পূর্ববর্তী সরকারের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্ত বিবরণে রাজনৈতিক দায়িত্ব শেষ না করে শিশুসুরক্ষাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হোক। শিশুদের নিরাপত্তা যেন ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে পরিবর্তিত রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না থাকে। প্রতিষ্ঠিত হোক এমন একটি স্থায়ী, জবাবদিহিমূলক সুরক্ষাব্যবস্থা, যেখানে সরকারের পরিচয় নয়, শিশুর অধিকারই হবে সর্বোচ্চ বিবেচ্য।
মনে রাখা প্রয়োজন, রাষ্ট্রের নৈতিক অধঃপতন সব সময় বৃহৎ রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় না। কখনো তা প্রকাশিত হয় একটি শিশুর নির্বাক কান্নায়, কখনো বিচারপ্রার্থী মায়ের দীর্ঘশ্বাসে, কখনো বিদ্যালয়ে যেতে ভয় পাওয়া কন্যাশিশুর আতঙ্কিত চোখে। একটি সমাজ যখন শিশুর ওপর সংঘটিত নৃশংসতায় সাময়িক উত্তেজিত হয়, অথচ সেই নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধে ব্যর্থ থাকে, তখন তার মানবিকতার দাবিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
শিশুরা রাষ্ট্রের করুণা প্রার্থনা করে না; তারা তাদের ন্যায্য অধিকার দাবি করে। যে রাষ্ট্র নিজের শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে পারে না, উন্নয়নের সমস্ত অলংকার পরিধান করেও সে রাষ্ট্র মানবিক সভ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। শিশু সুরক্ষা তাই আরেকটি সরকারি ঘোষণা, স্মারক বক্তৃতা কিংবা দিবসভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতার বিষয় হতে পারে না। এটি হতে হবে রাষ্ট্রের অবিচল অঙ্গীকার, প্রশাসনের প্রত্যক্ষ দায়িত্ব এবং
সমাজের আপসহীন নৈতিক অবস্থান। কারণ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়, কোনো কালক্ষেপণ ক্ষমার যোগ্য নয়।
লেখক: প্রদীপ্ত মোবারক, কলামিস্ট ও জনসংযোগ প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ