জন্মের পর থেকেই নানা শারীরিক জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে শিশু খাদিজাকে। সময়ের আগে জন্ম নেওয়ায় সে ছিল বেশ দুর্বল। এরই মধ্যে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।এমন পরিস্থিতিতে সন্তানের চিকিৎসা নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না বাবা-মা রতনা ও জিন্নার।
একদিকে শিশুকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা, অন্যদিকে চিকিৎসার খরচ জোগানোর চাপ। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে যখন চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তখনই পাশে দাঁড়ায় ডা. মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে অবশেষে বাবা-মায়ের কোলে ফিরেছে শিশু খাদিজা।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর শিশুটিকে বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সময়ের আগে জন্ম নেওয়ায় তার বাড়তি যত্নের প্রয়োজন ছিল। এরই মধ্যে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। কিন্তু পরিবারের পক্ষে ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (এমসিএইচটিআই), আজিমপুরের হাসপাতাল সমাজসেবা কর্মকর্তা মোছা. শিখা সরকারের পরামর্শে খাদিজাকে বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ডা. মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা শুরু হয়। বিনামূল্যে চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে শিশুটি।
অবশেষে আসে সেই অপেক্ষার মুহূর্ত। সন্তানের সুস্থতা ফিরে পাওয়ার স্বস্তি নিয়ে বাবা-মায়ের কাছে ফেরে খাদিজা। ১৪ অক্টোবর বুধবার বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুটিকে তার বাবা-মা রতনা ও জিন্নার কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা এই দম্পতির জন্য এটি ছিল দীর্ঘ দুশ্চিন্তার পর এক স্বস্তির মুহূর্ত।
আয়োজিত অনুষ্ঠানে 'ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড অ্যান্ড মাদার হেলথের' পরিচালক এবং 'ডা. মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশনের' প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. মজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিঙ্গাপুরের কেকে উইমেনস অ্যান্ড চিলড্রেনস হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর আবদুল আলিম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একই হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. নির্মল কাভাল্লুর বিশ্বরুথান, ডা. কৃষ্ণ জি. আর. এবং সিনিয়র রেসপিরেটরি থেরাপিস্ট আসিফ মুহাম্মদ। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন হাসপাতাল সমাজসেবা কর্মকর্তা মোছা. শিখা সরকার।
শিশু খাদিজার সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার পেছনে রয়েছে সময়মতো চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা। আর্থিক সংকটে থাকা একটি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে শিশুটির চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই সহায়তারই নজির গড়েছে ফাউন্ডেশনটি।
উল্লেখ্য, “পথনবজাতকেরা আপনজন, হবে না কোনো বিভাজন” এই মূলমন্ত্র নিয়ে ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করে ডা. মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশন। পরিত্যক্ত ও অভিভাবকহীন নবজাতকদের চিকিৎসা, সুরক্ষা এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি ফাউন্ডেশন-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৮৮ শিশুর দায়িত্ব নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়েছে তারা। এর মধ্যে ৬৭ শিশুকে দত্তক দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খাওয়া যে পরিবারটি একসময় সন্তানের সুস্থতা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিল, তাদের কাছে খাদিজার সুস্থ হয়ে ফিরে আসা এখন স্বস্তির খবর। শিশুটির এই ফিরে আসা একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, সময়মতো চিকিৎসা ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা বদলে দিতে পারে একটি পরিবারের কঠিন সময়।
