দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নানকে কাতারে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দেশে ফেরানোর উদ্যোগ
পুতুলের বিরুদ্ধে দুদকের চার্জশিট
দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নানকে কাতারে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইন্টারপোলের মাধ্যমে পাঠানো অনুরোধের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার তাকে গ্রেপ্তার করেছে কাতার পুলিশ। দুদকের সচিব সাইদুর রহমান খান এ কথা জানিয়েছেন।
ঢাকায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে ব্রিফিংয়ে সাইদুর রহমান খান বলেন, শনিবার অনানুষ্ঠানিকভাবে হান্নানের গ্রেপ্তারের খবর পায় দুদক। গতকাল রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তিনি কাতারের দোহায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) শাখার মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছ থেকে এ তথ্য পেয়েছে দুদক। শেখ আব্দুল হান্নানকে কাতার থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে দুদক সচিব সাইদুর বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে দুদকের কাছে কিছু তথ্য চেয়েছে। সেসব তথ্য সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি, প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে। আব্দুল হান্নান ২০২১ সালের ১২ জুন থেকে ২০২৪ সালের ১১ জুন পর্যন্ত বিমান বাহিনীর প্রধান পদে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে দুটি মামলা করে দুদক।
দুদকের উপপরিচালক মো. তানজির হাসিব সরকার বাদী হয়ে সংস্থাটির সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ মামলা দুটি দায়ের করেন।
দুদকের পক্ষ থেকে তখন সাংবাদিকদের জানানো হয়েছিল যে, আব্দুল হান্নানের জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ প্রায় তিন কোটি ২৮ লাখ টাকার সম্পদের খোঁজ তারা পেয়েছে। সেইসঙ্গে, তার নামে থাকা ছয়টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ২৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ‘সন্দেহজনক’ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের মধ্যেই ২০২৫ সালের ৫ মে আব্দুল হান্নান ও তার স্ত্রী-সন্তানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদালত। এরপর তাদের জমি, বাড়ি ও তিনটি ফ্ল্যাট জব্দ এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেইসঙ্গে, কাতারে অবস্থিত আব্দুল হান্নানকে ইন্টারপোলের সহায়তায় গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল দুদক।
পুতুলের বিরুদ্ধে দুদকের চার্জশিট : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে জীবনবৃত্তান্তে (সিভি) মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল রোববার এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিষয়টি জানিয়েছেন দুদকের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান।
২০২৫ সালের ২০ মার্চ মিথ্যা তথ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় চাকরি ও সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে ২০টি ব্যাংক থেকে ৩৩ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামে পৃথক দুটি মামলা করে দুদক। দুদকের অভিযোগে বলা হয়, ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে জমা দেওয়া সিভিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে (বর্তমান নাম বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ‘অনারারি স্পেশালিস্ট/এক্সপার্ট’ হিসেবে কাজ করার মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দেন সায়মা ওয়াজেদ। ওই তথ্য ব্যবহার করে তিনি সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ লাভ করেন।
দুদকের তদন্তে বলা হয়েছে, পুতুল ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি অন অটিজম অ্যান্ড নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার এবং সূচনা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এ কার্যক্রম চালান। সিভিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের সুনাম ক্ষুণ্ণ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। দুদকের তদন্তে আরও বলা হয়েছে, সিভিতে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নথি খোলা ও তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ না দিয়েই চাপ প্রয়োগ করা হয়। পরে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন, জাতিসংঘের কার্যালয় ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ডব্লিউএইচওর সদর দপ্তরে এসব তথ্য পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুতুল আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পান।
দুদকের এজাহারে বলা হয়, আসামি সায়মা ওয়াজেদ হোসেন ওরফে সায়মা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষকতা বা শিক্ষা ম্যানুয়েল তৈরি বা রিভিউ সম্পর্কিত কার্যক্রমে অংশ না নিয়েও নিজেকে এই কাজে সম্পর্কিত মর্মে মিথ্যা দাবি করে ২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় আবেদন করেন। পরবর্তীসময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পেয়ে দণ্ডবিধির ৪২০/৪৬৮/৪৭১ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এর ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মাধ্যমে ২০১৭ সালে অটিজম ও স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যাবিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন নিযুক্ত হন সায়মা ওয়াজেদ। ওই পদে কর্মরত অবস্থায় ২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় দাখিল করা সিভিতে নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে পুতুল লেখেন- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা/শিক্ষা ম্যানুয়েল রিভিউ সম্পর্কিত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, অটিজম এবং মানসিক সমস্যা সংক্রান্ত কারিগরি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন।
