নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩০ জন। গতকাল মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার সময় বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার সোহেল রানা। এ সময় চালক ও সহকারী পেছনের সিটে ঘুমাচ্ছিলেন বলে আহত যাত্রীরা জানিয়েছেন। দুর্ঘটনায় আরপি স্পেশাল বাস ও বালুবাহী ট্রাক— দুই বাহনের চালকই নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার কারণ জানতে নাটোরের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নাটোর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরিফুল হক জানিয়েছেন, বরগুনা থেকে রাজশাহীগামী আরপি স্পেশাল বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, নাটোর সদর হাসপাতালসহ স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বলেন, বালুবাহী যেই ট্রাকটির সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটেছে সেই ট্রাকটি বাম লেনেই ছিল। কিন্তু বাসটি হঠাৎ ডান পাশে চলে যাওয়ার পরই মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবরে বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের রেজুর মোড়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল ৩৮ জনের। ঠিক ১২ বছর পর আবারও সেই ২০ অক্টোবরই বনপাড়ায় ১২ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনায় উপজেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বরগুনা থেকে আসা আরপি পরিবহনের বাসটি বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। বরগুনা থেকে রাতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাসটি নাটোরে পৌঁছাতে অন্তত পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লেগেছে এবং ভোরে বাসটির চালক ঘুমিয়ে যাওয়ার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটতে পারে।
বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ট্রাকটি তার লাইনেই ছিল। বাসের ড্রাইভারের তন্দ্রা চলে এসেছিল, সে কারণেই ট্রাকটিকে ধাক্কা দিয়েছে। তিনি জানান, বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হওয়ায় বাস ও ট্রাক— দুটি বাহনেরই চালক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বাসের সামনের দিকে যারা ছিল তাদের অনেকেই এই দুর্ঘটনায় নিহত হন। দুর্ঘটনার সময় বাসটিতে যারা যাত্রী ছিলেন তাদের সবাই কমবেশি আহত হয়েছেন। আর ট্রাক ড্রাইভারের মরদেহ ট্রাকের দরজা কেটে বের করতে হয়েছে। তিনি বলেন, নিহত ১২ জন ছাড়া হাসপাতালে যাদের ভর্তি করা হয়েছে তাদের বেশ কয়েকজনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। গুরুতর আহত বেশির ভাগকেই রাজশাহী মেডিক্যাল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে।
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন— রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ারুল হক (৩০), পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সুবিধখালী গ্রামের আজহার হাওলাদারের ছেলে শহীদুল ইসলাম (৪৫) ও শহীদুল ইসলামের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮), শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের জহরউদ্দিনের ছেলে জুয়েল (৪০), একই উপজেলার ডুবি সাহিবর গ্রামের ইউনুস আলী শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (৩০), জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে আব্দুস সালাম মোল্লা (৪৬), আরব আলী ফকিরের ছেলে আব্দুস সামাদ ফকির (৭০), পালের চর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক ব্যাপারীর ছেলে শাহীন আহমেদ (৩২), ট্রাকচালক ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বড় মান্দারবাড়ীয়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে আবু কালাম (৫৫), নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার ঘোনটোলা গ্রামের সাজ্জাদ হোসেনের ছেলে রাসেল (৩৩) ও ফরিদপুর সদর উপজেলার বাখোন্দিয়া গ্রামের অমর কুমার জমাদারের ছেলে হিমেশ জমাদার (৩৫)।
আহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে তারা হলেন— শরীয়তপুর জেলার আলমগীর মাতবর (৫৫), চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আব্দুস সালাম (৩৫), শিবগঞ্জের ওয়াহিদ আলী (২২), মাদারীপুর জেলার নাইম তালুকদার (২০), নার্গিস আক্তার (৩৫), বরগুনার জেসমিন আক্তার (৩৫), নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার চিরঞ্জিত কুমার (২৫), মান্দা উপজেলার মানিক হোসেন (৩৭), শাহাজুল ইসলাম (৩৬), লক্ষ্মীপুর জেলার রাকিব হোসেন (২৫)। অন্যদের নাম-পরিচয় এখনও জানা যায়নি।
নিহতদের মধ্যে নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন আনোয়ারুল হক আনোয়ার (৩০)। নাটোরের বড়াইগ্রামে মঙ্গলবার ভোরে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হয়েছেন। নিহত আনোয়ার হোসেন রাজশাহীর বাগমারার শ্রীপুর ইউনিয়নের চাঁইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। আনোয়ারের ভাতিজা মিজানুর রহমান জানান, আনোয়ার ঢাকায় থাকতেন এবং একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। মাস-দুয়েক আগে একটি প্রকল্পে নতুন চাকরি পান। নতুন চাকরি পাওয়ার পর ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। নাটোর-রাজশাহী মহাসড়কের পুঠিয়ায় বাস থেকে নামার কথা ছিল। সেখান থেকে বাড়িতে পৌঁছাবেন বলে মোবাইল ফোনে পরিবারকে জানিয়েছিলেন। মঙ্গলবার কালে চাঁইপাড়া গ্রামে আনোয়ারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকের মাতম। পরিবারের সদস্যদের ঘুম ভেঙেছে দুঃসংবাদে। আনোয়ারের স্ত্রী ফাতেমা বিবি বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, আহতরা সবাই তুলনামূল ভালো পজিশনে আছেন। তবে কারও কারও ইন্টারনাল ব্লিডিং হতে পারে। তাই ৪৮ ঘণ্টার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু গণমাধ্যমকে বলেন, এ ঘটনায় সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সড়কটিতে যে পরিমাণ যানবাহন চলাচল করে সে তুলনায় এই সড়কটি ছোট। যে কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। আর সড়কটি অনেকটাই ওভারলোডেড। অনেক বেশি যান চলাচল করে। আবার অনেক যানবাহন উচ্চগতিতে চলাচলের কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটছে। যদি রাস্তাটি চার লেনের করা যায় তাহলে এই এলাকায় দুর্ঘটনা কিছুটা কমানো যাবে।
চালক ঘুমাচ্ছিলেন, চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার : বাসের যাত্রী ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রমজান আলী। তিনি বলেন, আমি বাসের চালকের সিটের দুই সিট পেছনে বসে ছিলাম। বাসটি রাত আনুমানিক ৩টার দিকে পাবনার ঈশ্বরদীতে পৌঁছালে চালকের আসন থেকে চালক উঠে যান এবং সুপারভাইজার বাস চালাতে শুরু করেন। বাসের দরজা বন্ধ করে চালক ও তার সহকারী পেছনের সিটে ঘুমাতে যান। এর ঘণ্টাখানেক পর বাসটি বনপাড়ায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। বাসের আহত যাত্রী ইয়াকুব আলী ও আব্দুস সালাম প্রায় একই ধরনের কথা বলেছেন।
দুর্ঘটনার পর হতাহতদের মালামাল লুট : বাসের আহত যাত্রী রাকিব হোসেনসহ আরও কয়েকজন বলেন, চেতনা ফিরলে তারা দেখেন, কয়েকজন লোক তাদের মোবাইল, মানিব্যাগ ও টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। বাসে আটকে থাকার কারণে কিছুই বলতে পারছিলাম না তারা। তবে কিছু মানুষ তাদের বাস থেকে বের হতে সহযোগিতা করেছেন।
লুটপাটের বিষয়ে জানতে চাইলে নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, কিছু মানুষ সবখানেই এরকম আছেন, যারা বিপদের মাঝেও মানুষকে অসহযোগিতা করেন। ঘটনার পর দেড় লাখ টাকা ও কিছু মালামাল উদ্ধার করছি, সেগুলো আহত ও নিহতদের স্বজনদের বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভুল তথ্য : দুর্ঘটনার খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে আসেন নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন। তিনি বলেন, বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩০ জন। যদিও পরে মৃতদেহ বনপাড়া হাইওয়ে থানায় নিয়ে আসার পরে জানা যায় ১৪ জন নয়, ১২ জন মারা গেছেন। তখন নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, ১২ জন মারা গেছেন, ১৪ জন নয়।
পরিবারের কাছে মৃতদেহ হস্তান্তর : পরিচয় শনাক্তের পর থেকেই শুরু হয় মরদেহ হস্তান্তরের কার্যক্রম। একেকটি পরিবার যখন থানায় এসে তাদের প্রিয়জনের মরদেহ চিনতে পারছিলেন, তখন তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছিল চারপাশের পরিবেশ। বনপাড়া হাইওয়ে থানার এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, আমরা ১২টি পরিবারের কাছে ১২ জনের মৃতদেহ হস্তান্তর করেছি। যে মালামালগুলো তারা চিহ্নিত করেছে, সেগুলো তাদের পরিবারকে দিয়ে দেওয়া হয়।
