ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খাদ্য সংকট, বাস্তুচ্যুতি ও নিরাপত্তাহীনতা। একদিকে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে অর্থের অভাবে কমিয়ে আনা হচ্ছে মানবিক সহায়তা। ফলে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধের মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াই চালানো লাখো ফিলিস্তিনির সামনে নতুন করে দেখা দিয়েছে অনাহার ও শীতের দুর্ভোগের আশঙ্কা।
নিহত ৭৪ হাজার ছাড়িয়েছে : গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে উপত্যকাটিতে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৪৬৯। আহত হয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৯২ জন। সাম্প্রতিক ৪৮ ঘণ্টায় আরও ছয়জন নিহত ও ৪৩ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, বহু মানুষ এখনো ধসে পড়া ভবন ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। উদ্ধারকাজের মাধ্যমে নতুন মরদেহ পাওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ছে।
ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার ৭৫ মরদেহ : গাজা সিটির দারাজ এলাকায় ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ৭৫ ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব মরদেহ ভবনের নিচে পড়ে ছিল। পরে সেগুলো উদ্ধার করে একসঙ্গে জানাজা ও দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় আট হাজার মানুষের মরদেহ পড়ে থাকতে পারে। উপত্যকাটির প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাড়িঘর, হাসপাতাল, সড়ক ও অন্যান্য জরুরি স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতিতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পাঁচ লাখ মানুষ হারাতে পারে খাদ্যসহায়তা : এমন পরিস্থিতিতে অর্থের সংকটের কারণে গাজায় খাদ্যসহায়তা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি। সংস্থাটি জানিয়েছে, অর্থায়নের ঘাটতিতে তাদের নিয়মিত সহায়তা কার্যক্রম সংকুচিত করতে হচ্ছে। এর ফলে প্রায় পাঁচ লাখ ফিলিস্তিনি মাসিক খাদ্যসহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, গাজায় মাসিক খাদ্যসহায়তা পাওয়া মানুষের সংখ্যা ১৬ লাখ থেকে কমিয়ে ১১ লাখে নামিয়ে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি খাদ্য বরাদ্দ অর্ধেক করা হয়েছে। প্রায় ৭৫ হাজার পরিবারের জন্য নগদ অর্থসহায়তাও কমানো হচ্ছে। যেসব মানুষের রান্না করার ব্যবস্থা নেই, তাদের জন্য প্রতিদিন সরবরাহ করা রান্না করা খাবারের সংখ্যাও আড়াই লাখ থেকে কমিয়ে দেড় লাখে আনা হয়েছে। দুর্গম এলাকার কিছু পরিবার এক দিন পরপর মাত্র একবার রান্না করা খাবার পাচ্ছে।
চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ১৪ লাখ মানুষ : বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১৪ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। উপত্যকাটির মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতে পারছে না। তাদের মধ্যে প্রায় দুই লাখ মানুষ জরুরি খাদ্য সংকটের পরিস্থিতিতে রয়েছে। যুদ্ধের কারণে বহু পরিবার আয়, কর্মসংস্থান ও জীবিকার উৎস হারিয়েছে। বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সীমিত থাকায় এবং খাদ্যসহায়তা কমে যাওয়ায় তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশে বিধিনিষেধের কারণে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
সামনে শীত, নেই নিরাপদ আশ্রয় : গাজায় বাস্তুচ্যুত মানুষের বড় অংশকে বারবার ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছে। অনেক পরিবার তাঁবু কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছে। পর্যাপ্ত পানি, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় তাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক কার্ল স্কাউ বলেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক বছর পরও গাজার মানুষের জীবন অত্যন্ত কঠিন। উপযুক্ত আশ্রয়, মৌলিক সেবা ও নিরাপত্তার অভাব এখনো প্রকট। সামনে শীত আসায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে জরুরি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আগামী ছয় মাসের জন্য ৪৫ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। কার্ল স্কাউ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামলা : ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও গাজায় প্রাণহানির ঘটনা থামেনি। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফার তথ্য অনুযায়ী, মধ্য গাজার মাগাজি শরণার্থীশিবিরে বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু লক্ষ্য করে গুলিতে মিস্ক হাজেম আল-দালু নামের এক কিশোরী নিহত হয়েছে। দক্ষিণ গাজার রাফাহর আল-মাওয়াসি এলাকায় এবং খান ইউনিসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পরও ১ হাজার ৫১১ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ৩৭৫ জন আহত হয়েছে। এ সময়ে বিভিন্ন স্থান ও ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও ৮৩৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
পশ্চিম তীরেও সহিংসতা : গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও উত্তেজনা ও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনি গ্রাম তাইবেহের কাছে জলপাই সংগ্রহকারীদের দেখতে যাওয়া ইউরোপীয় কূটনীতিকদের একটি দলের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। দলটিতে বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের কূটনীতিক এবং ধর্মীয় প্রতিনিধিরা ছিলেন। ফ্রান্সের একজন মেয়রকে মারধর করা হয়েছে বলে বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন। এদিকে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি এসব হামলা ঠেকাতে ইসরায়েলকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে গাজায় যুদ্ধের ক্ষত, খাদ্য সংকট, আশ্রয়হীনতা ও তহবিলের ঘাটতি পরস্পরকে আরও গভীর করছে। জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসাসহায়তা নিশ্চিত করা, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের অগ্রগতি না হলে উপত্যকাটির মানবিক সংকট আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
