নোবেল কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের গবেষণা অর্থনীতির উত্থান-পতন সামলাতে নীতিনির্ধারকদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কতটা কমবে, মন্দার সময় সরকারি বা মুদ্রানীতির পদক্ষেপে মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের প্রত্যাশা বর্তমান ভোগকে কীভাবে প্রভাবিত করবে—এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সামষ্টিক অর্থনীতির প্রচলিত কাঠামোই বদলে দিয়েছেন রবার্ট ই হল ও মাইকেল উডফোর্ড। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তকে সামগ্রিক অর্থনীতির ওঠানামার সঙ্গে যুক্ত করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নীতির নতুন তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তোলার স্বীকৃতিতেই চলতি বছর অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন এ দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ।
গতকাল রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস তাদের নাম ঘোষণা করে। পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যায় তাদের অবদানকে বলা হয়েছে, ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক ভিত্তি’ নির্মাণ। নোবেল কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের গবেষণা অর্থনীতির উত্থান-পতন সামলাতে নীতিনির্ধারকদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
একসময় সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেলে মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন, ভোগ ও কর্মসংস্থানের মতো সূচকের মধ্যে অতীতের পরিসংখ্যানগত সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো। কিন্তু নীতি বদলালে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও তাদের সিদ্ধান্ত বদলায়। ফলে পুরনো সম্পর্ক সবসময় একইভাবে কাজ করে না। হল ও উডফোর্ডের গবেষণা এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের আচরণকে সামষ্টিক মডেলের ভিত্তিতে নিয়ে আসে। অর্থাৎ নিচের স্তরের লাখো সিদ্ধান্ত কীভাবে মিলিত হয়ে পুরো অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে, সেটিই তাদের গবেষণার কেন্দ্রে।
রবার্ট হল বিশেষভাবে দেখিয়েছেন, পরিবারের ভোগ শুধু বর্তমান আয়ের ওপর নির্ভর করে না; ভবিষ্যৎ আয় ও সম্পদ সম্পর্কে তাদের প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যাশায় নতুন ও অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটলে ভোগের সিদ্ধান্তও বদলায়। তার এ গবেষণা অর্থনীতিতে ‘র্যান্ডম ওয়াক’ ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভোগ ও সঞ্চয়ের আচরণ বিশ্লেষণে নতুন ভিত্তি তৈরি করে। শ্রমবাজার নিয়েও হলের কাজ গুরুত্বপূর্ণ। চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতার মধ্যে মিল হতে সময় ও তথ্যের যে বাধা থাকে, তা বিবেচনায় নিয়ে তিনি দেখান কেন অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালেও বেকারত্ব দ্রুত কমে না।
অন্যদিকে মাইকেল উডফোর্ড আধুনিক মুদ্রানীতির তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখেন। দাম সবসময় তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তিত হয় না—অর্থনীতির এ বাস্তবতা, মানুষের ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা এবং সুদের হারের প্রভাবকে একই মডেলে নিয়ে তিনি দেখান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কীভাবে নীতিসুদের মাধ্যমে চাহিদা ও মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
উডফোর্ডের গবেষণা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যোগাযোগকেও নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ভবিষ্যতে সুদের হার কোন পথে যেতে পারে, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্য সংকেত বর্তমান ভোগ, বিনিয়োগ ও মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। এ ধারণাই পরে ‘ফরওয়ার্ড গাইডেন্স’-এর তাত্ত্বিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করে, যা বিশেষ করে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
নোবেল কমিটির মূল্যায়ন, তাদের কাজ স্থিতিশীলতা নীতিকে নতুন জীবন দিয়েছে এবং অর্থনীতির উত্থান-পতন মোকাবেলায় আরো কার্যকর নীতি তৈরির সুযোগ করে দিয়েছে।
