জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ, কম মজুরি, সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়া বাড়ির দাম এবং বাজেট-সংকটে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর ক্ষোভ জানিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউরোপজুড়ে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে চলা এসব বিক্ষোভের বেশ কয়েকটি সহিংসতা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে রূপ নিলেও অনেক প্রতিবাদই শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্স। শিক্ষা ব্যয় ও জীবনযাত্রার উচ্চমূল্যের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের সপ্তাহজুড়ে চলা আন্দোলনের অংশ হিসেবে শনিবার (১৭ অক্টোবর) দেশজুড়ে সাড়ে ৫ লাখেরও বেশি মানুষ বিক্ষোভ করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
জনগণের এই ক্ষোভ মূলত সরকারি অর্থায়নের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনকেই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে, যা নিয়ন্ত্রণে সরকারগুলো এখন হিমশিম খাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে ইউরোপের অনেক দেশ আজ দেনায় জর্জরিত, আর সেই ঋণের বোঝাও দিন দিন আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। ২০০২ সালের পর ফ্রান্সে ঋণ নেওয়ার খরচ এখন সবচেয়ে বেশি। সরকার সুদের পেছনে যত বেশি অর্থ ব্যয় করছে, আন্দোলনকারীদের কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা, হাসপাতাল বা পেনশনের পেছনে দেওয়ার মতো অর্থ তাদের হাতে ততটাই কমে আসছে।
সরকার কীভাবে অর্থ ঋণ নেয়?
সাধারণ মানুষ যেভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, সরকারগুলোও অনেকটা সেভাবেই অর্থ ধার করে। তবে ব্যাংকে যাওয়ার বদলে তারা মূলত ‘বন্ড’ বিক্রি করে। এর বিনিময়ে সরকার বন্ড ক্রেতাদের নির্দিষ্ট হারে সুদ দেয় এবং একটি নির্ধারিত তারিখে পুরো আসল অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
একটি ১০ বছর মেয়াদি বন্ড হলো মূলত একটি ঋণ, যা সরকার এক দশক পর পরিশোধ করে। আর এর লভ্যাংশ হলো বিনিয়োগকারীরা ঋণ দিয়ে যে মুনাফা অর্জন করে তা। একটি দেশ তার ঋণ কতটা দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে পারছে এবং বাজার সেটির ওপর কতটা আস্থা রাখে, তা পরিমাপের সবচেয়ে বড় মানদণ্ড হলো এই লভ্যাংশ।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন বিনিয়োগকারী ১০০ ইউরো দিয়ে একটি ১০ বছর মেয়াদি বন্ড কিনলে ২.৫ শতাংশ সুদের হারে তিনি প্রতি বছর ২.৫০ ইউরো করে ১০ বছরে মোট ২৫ ইউরো সুদ পাবেন। আর ৫ শতাংশ সুদের হার হলে বছরে ৫ ইউরো করে মোট ৫০ ইউরো সুদ পাবেন এবং ১০ বছর মেয়াদ শেষে তার মূল ১০০ ইউরো ফেরত পাবেন।
ঋণগ্রহণ যখন আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে তখন কী ঘটে?
বন্ডের দাম যখন কমে যায়, তখন সুদের হার বাড়ে। ফলে ঋণ নেওয়া আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত বন্ধকী সুদের হারের মুখোমুখি হওয়া কোনো পরিবারের মতোই, একটি সরকারও তখন সুদের পেছনে বেশি অর্থ ব্যয় করে এবং শিক্ষা, হাসপাতাল ও রাস্তার মতো মৌলিক খাতগুলোর জন্য তাদের হাতে কম অর্থ থাকে।
২০০০-এর দশকের শুরুতে ইউরো চালু হওয়ার পর থেকে প্রধান ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য ১০ বছর মেয়াদি ঋণের সুদের হার এত বেশি (৫ শতাংশ) আর কখনো ওঠেনি। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরো অঞ্চল ঋণ সংকটের সময়ে কেবল গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো সংকটাপন্ন দেশগুলোকেই ওই পরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি সুদ গুনতে হয়েছিল। এমনকি সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগাল বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছিল এবং তাদের দেউলিয়া হওয়া এড়াতে আন্তর্জাতিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল।
জার্মানি যেখানে ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য ৩.৪১ শতাংশ সুদ দেয়, সেখানে ফ্রান্সকে দিতে হচ্ছে প্রায় ৫ শতাংশ। এই বিশাল ব্যবধান দেখায় যে, ফ্রান্সকে টাকা ধার দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি মনে করায় বিনিয়োগকারীরা এখন জার্মানির চেয়ে বেশি লাভ বা রিটার্ন চাইছেন।
জার্মানির ৩.৪১ শতাংশের তুলনায় ফ্রান্সকে এখন ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান ব্যবধান এটিই প্রকাশ করে, ফ্রান্সকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা এখন আরও বেশি মুনাফা বা রিটার্ন দাবি করছেন। ইউরো অঞ্চলের ঋণ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দুটি দেশ—ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও ফ্রান্স এখন বেশি সুদ গুনছে। কেবল ইউরো অঞ্চলের বাইরে থাকা যুক্তরাজ্যকেই তাদের চেয়ে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে।
কোন দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঋণে জর্জরিত?
সবচেয়ে বড় সরকারি ঋণের তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাদের ঋণের পরিমাণ ৪১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট অর্থনীতির বা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ কারেন্সি ‘ডলারে’ ঋণ নেওয়ার কারণে বাড়তি সুবিধা পায়, যা দেশটির ঋণের ওপর আন্তর্জাতিক চাহিদা বজায় রাখে। তবে তাদের ঋণ নেওয়ার সক্ষমতাও সীমাহীন নয়।
এর পরেই রয়েছে চীন, যাদের ঋণের পরিমাণ ২২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ১০৪ শতাংশ)। অন্যদিকে জাপানের ঋণ ৮.৭ ট্রিলিয়ন ডলার এবং প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে তাদের ঋণের অনুপাত সবচেয়ে বেশি (জিডিপির ১৯৯ শতাংশ)। যুক্তরাজ্যের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা তাদের জিডিপির ১০২ শতাংশ।
বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় ফ্রান্সের অবস্থান পঞ্চম। দেশটির মোট ঋণের পরিমাণ ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা তাদের মোট অর্থনীতির (জিডিপি) ১১৮.৫ শতাংশ। অর্থের অঙ্কে এটি ইতালির চেয়ে বেশি (ইতালির ঋণ ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার)। তবে অর্থনীতির আকারের তুলনায় হিসাব করলে ইতালির ঋণের বোঝাই বেশি ভারী, যা তাদের জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে জার্মানির ঋণের পরিমাণ ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা তাদের জিডিপির মাত্র ৬৫ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ বেড়ে জিডিপির ১২১.৮ শতাংশে পৌঁছাবে, যা দেশটির সরকারি অর্থায়নকে একটি টেকসই পথে ফেরানোর প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলছে।

বাংলাদেশের ঋণ কত?
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১২ জুলাই জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। ওই দিন সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান। এসময় তিনি বলেন, ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর এবং ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে সরকার।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাও আইএমফের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সরকারের ঋণ নেওয়ার তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। দেশের ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার (জিডিপির ৪০ শতাংশ)।
ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, সরকার, পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিশ্বব্যাপী মোট ঋণের পরিমাণ চলতি বছরের প্রথমার্ধ্বে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এটি পৃথিবীর প্রতিজন মানুষের জন্য গড়ে প্রায় ৪৪ হাজার ডলারের সমপরিমাণ। এই বৃদ্ধির একটি বড় অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো থেকে।
এই ঋণের মূল্য পরিশোধ করা বেশ ব্যয়বহুল। উন্নত অর্থনীতিগুলো গত এক বছরে তাদের সরকারি বন্ডের সুদের পেছনে ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছে। এটি সামরিক ক্ষেত্র (৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার) কিংবা পরিবেশবান্ধব শক্তি বা ক্লিন এনার্জির (২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার) পেছনে বিশ্বের মোট খরচের চেয়েও বেশি।
সাধারণ জনগণের জন্য সুদের খরচ বাড়ার অর্থ হলো শিক্ষা, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো সামাজিক সেবাগুলোতে কম অর্থ বরাদ্দ থাকা। এই বিল মেটাতে সরকারগুলোকে কর বাড়াতে হতে পারে কিংবা ব্যয় ছাঁটাই করতে হতে পারে। পাশাপাশি সরকারি ঋণের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের বন্ধকী ঋণ (মরগেজ), গাড়ি ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও বেড়ে যেতে পারে।
সূত্র : আলজাজিরা
ওয়াইএ/এসএম
