বাংলা সাহিত্যের এই ছয় মহিলা গোয়েন্দার প্রত্যেকের গল্প আলাদা। তাঁদের কারও সঙ্গে হয়তো আপনার পরিচয় রয়েছে, আবার কারও নাম হয়তো এই প্রথম শুনছেন। চলুন, ফিরে দেখা যাক এই ছয় গোয়েন্দার রহস্যময় দুনিয়া।

৬ মহিলা গোয়েন্দাছবি : এআই
গোয়েন্দা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ব্যোমকেশ বক্সী, ফেলুদা, কিরীটী রায় কিংবা কর্নেলের মুখ। বাংলা সাহিত্যে তাঁদের নিয়ে অসংখ্য গল্প ও আলোচনা থাকলেও মহিলা গোয়েন্দারাও যে রহস্যের জট ছাড়াতে পারেন, তার প্রমাণও রয়েছে। তাঁদের অনেকের কাহিনি পাঠকের কাছে বেশ জনপ্রিয়। কেউ ব্যক্তিগত আক্রোশে অপরাধীদের ধরতে নেমেছেন, কেউ আবার কৌতূহলবশত জড়িয়ে পড়েছেন রহস্যের জালে। কারও অস্ত্র যুক্তি, কেউ বিপদের মুখেও মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করেন। আবার কারও অভিযানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নিজের পরিবারের গল্প। কৃষ্ণা, গণ্ডালু, মিতিন মাসি থেকে রুদ্রাণী — বাংলা সাহিত্যের এই ছয় মহিলা গোয়েন্দার প্রত্যেকের গল্প আলাদা। তাঁদের কারও সঙ্গে হয়তো আপনার পরিচয় রয়েছে, আবার কারও নাম হয়তো এই প্রথম শুনছেন। চলুন, ফিরে দেখা যাক এই ছয় গোয়েন্দার রহস্যময় দুনিয়া।
গোয়েন্দা কৃষ্ণাছবি: সংগৃহীত।
বাংলা সাহিত্যে মহিলা গোয়েন্দার কথা উঠলে প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর সৃষ্ট কৃষ্ণার নাম উল্লেখ করতেই হয়। বিভিন্ন সাহিত্য আলোচনায় তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা গোয়েন্দা বলা হয়েছে। পঞ্চাশের দশকে ‘প্রহেলিকা’ ও ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ উপন্যাসের মাধ্যমে পাঠকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। কৃষ্ণার গোয়েন্দা হয়ে ওঠার গল্প অন্যদের থেকে আলাদা। তাঁর বাবা সত্যেন্দ্র চৌধুরীর শত্রুতার জেরে বিপদে পড়ে গোটা পরিবার। পরে বাবা-মাকে হারান কৃষ্ণা। সেই ঘটনাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্প থেকেই শুরু হয় তাঁর রহস্যের সন্ধান।কৃষ্ণার কাছে গোয়েন্দাগিরি নিছক শখ নয়; এর পিছনে রয়েছে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ও প্রতিশোধের তাগিদ। বিপদে পড়েও তিনি পিছিয়ে আসেন না। বুদ্ধি ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে রহস্যের কিনারা করেন। তাঁকে নিয়ে মোট ১১টি উপন্যাস লেখা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে মহিলা গোয়েন্দাদের দীর্ঘ যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম কৃষ্ণা।
গোয়েন্দা গণ্ডালুছবি: সংগৃহীত।
গোয়েন্দাগিরির গল্প পড়তে বড় হতে হবে, এমন নয়। ছোটদের জন্যও রহস্যের দুনিয়া তৈরি করেছিলেন লেখিকা নলিনী দাশ। ছয়ের দশকের গোড়ায় তাঁর লেখা ‘গোয়েন্দা গণ্ডালু’ বাংলা শিশুসাহিত্যে বিশেষ জায়গা করে নেয়। কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে চার কিশোরী — কালু, মালু, টুলু ও বুলু। বোর্ডিং স্কুলে থাকা চার বান্ধবীর দিন কাটে নানা রহস্য ও রোমাঞ্চে। কখনও তারা অদ্ভুত ঘটনার তদন্ত করে, কখনও বিপদে পড়ে নিজেদের বুদ্ধিতে পরিস্থিতি সামলায়। বয়সে ছোট হলেও গোয়েন্দাগিরিতে তারা মোটেই পিছিয়ে নেই। গণ্ডালুর গল্পের আকর্ষণ এখানেই। চার বান্ধবীর বন্ধুত্বের সঙ্গে মিশে রয়েছে অজানাকে জানার প্রবল আগ্রহ। নিজেদের উদ্যোগে রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে তারা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। ছোটদের গোয়েন্দা গল্পে মেয়েদের এমন সক্রিয় উপস্থিতি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। রহস্যের পাশাপাশি গল্পগুলিতে রয়েছে বন্ধুত্ব ও একসঙ্গে বিপদের মোকাবিলার আনন্দ।
মিতিন মাসিছবি: সংগৃহীত।
বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় মহিলা গোয়েন্দাদের তালিকায় মিতিন মাসির নাম থাকবেই। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের সৃষ্টি প্রজ্ঞাপারমিতা মুখোপাধ্যায় পাঠকের কাছে মিতিন মাসি নামেই পরিচিত। ২০০২ সালে ‘আনন্দমেলা’র পুজো সংখ্যায় তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ। তার পর একের পর এক রহস্যকাহিনিতে তিনি পাঠকের মন জয় করেছেন। মিতিনের গোয়েন্দাগিরির ধরন আলাদা। তদন্তে তিনি শুধু চোখে দেখা তথ্যের উপর নির্ভর করেন না। অপরাধবিজ্ঞান, ফরেন্সিক সায়েন্স, অপরাধীর মনস্তত্ত্ব, অ্যানাটমি ও ফিজ়িওলজি-সহ নানা বিষয়ে তাঁর জ্ঞান রয়েছে। প্রয়োজনমতো সেগুলি কাজে লাগিয়ে রহস্যের জট খোলেন মিতিন। আত্মরক্ষার স্বার্থে ক্যারাটে জানেন, প্রয়োজনে রিভলভারও সঙ্গে রাখেন। তবে মিতিনকে শুধু গোয়েন্দা হিসেবে দেখলে তাঁর চরিত্রের অনেকটাই বাদ পড়ে যায়। বাড়ির কাজ ও রান্নাবান্না সামলানোর পাশাপাশি তিনি ব্যক্তিগত জীবন ও পেশার মধ্যে ভারসাম্য রাখেন। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর মধ্যে রয়েছে বাস্তববোধও। এই পরিচিত, ঘরোয়া অথচ দৃঢ়চেতা স্বভাবই মিতিনকে পাঠকের কাছে আপন করে তুলেছে।
গোয়েন্দা দময়ন্তীছবি: সংগৃহীত।
বাংলা রহস্যসাহিত্যের আর এক পরিচিত মহিলা গোয়েন্দা দময়ন্তী সেন। লেখক মনোজ সেনের হাত ধরে সাতের দশকে তাঁর আত্মপ্রকাশ। ১৯৭৪ সালে ‘রোমাঞ্চ’ পত্রিকায় প্রথম দেখা যায় দময়ন্তীকে। পরে তাঁকে নিয়ে একাধিক রহস্যকাহিনি লেখেন মনোজ সেন। দময়ন্তীর অনুসন্ধানের ধরন পাঠকদের কাছে পরিচিত। নানা ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে তিনি রহস্যের গভীরে পৌঁছনোর চেষ্টা করেন। একের পর এক সূত্র জুড়ে জটিল ঘটনার সমাধান করাই তাঁর অভিযানের মূল আকর্ষণ। দীর্ঘদিন পর দময়ন্তী আবারও আলোচনায় এসেছেন। বইয়ের পাতার পাশাপাশি ওটিটি মাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে তাঁর রহস্য সমাধানের কাহিনি। ফলে পুরোনো পাঠকদের স্মৃতির পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও পৌঁছে গিয়েছে চরিত্রটি। মাধ্যম বদলালেও দময়ন্তীর মতো গোয়েন্দাদের প্রতি আগ্রহ যে এখনও রয়েছে, তাঁর প্রত্যাবর্তনই তার প্রমাণ।
গোয়েন্দা গার্গীছবি: সংগৃহীত।
গোয়েন্দা হওয়ার জন্য ছোটবেলা থেকেই সেই স্বপ্ন দেখতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। তপন বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট গার্গী বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প তারই উদাহরণ। নয়ের দশকে বাংলা সাহিত্যে তাঁর আত্মপ্রকাশ। শুরুতে গার্গী ছিলেন গণিতের ছাত্রী। রহস্যের প্রতি আগ্রহ থেকেই শখের গোয়েন্দাগিরি শুরু করেন। পরে সেই আগ্রহই তাঁকে একের পর এক রহস্যের ঘটনায় জড়িয়ে ফেলে। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র রবিবাসরীয় পাতায় প্রকাশিত গার্গীর কাহিনি পাঠকের মধ্যে জনপ্রিয় হয়। তাঁর তদন্তের মূল ভরসা যুক্তি ও পর্যবেক্ষণ। ঘটনার খুঁটিনাটি থেকে সূত্র খুঁজে বের করে তিনি রহস্যের সমাধানে পৌঁছন। আবেগের বদলে যুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়াই তাঁর তদন্তের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।গার্গীর কাহিনির আকর্ষণ শুধু রহস্য সমাধানে নয়, তাঁর গোয়েন্দা হয়ে ওঠার মধ্যেও রয়েছে। শখ থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা তাঁকে ক্রমশ দক্ষ অনুসন্ধানীতে পরিণত করে। তাঁকে নিয়ে প্রায় ৩০টি উপন্যাস লেখা হয়েছে। এমনকী সিনেমার পর্দাতেও জায়গা করে নিয়েছে এই চরিত্র।
রুদ্রাণী: নিখোঁজ বাবার খোঁজে শুরু রহস্যের অভিযানছবি: সংগৃহীত।
সমকালীন বাংলা সাহিত্যে মহিলা গোয়েন্দার চরিত্রে আলাদা মাত্রা যোগ করেছেন দেবারতি মুখোপাধ্যায়। তাঁর সৃষ্টি রুদ্রাণীর প্রথম আত্মপ্রকাশ ২০১৬ সালে ‘ঈশ্বর যখন বন্দী’ উপন্যাসে। পরে রুদ্রাণী ও তাঁর জীবনসঙ্গী প্রিয়মকে ঘিরে একাধিক রহস্যকাহিনি প্রকাশিত হয়েছে। রুদ্রাণী পেশায় ব্যাঙ্ককর্মী। তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেই রয়েছে এক রহস্য। প্রত্নতত্ত্ববিদ বাবা ড. সুরঞ্জন সিংহরায় দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। তাঁকে খুঁজে বের করার তাগিদেই রুদ্রাণীর প্রথম অভিযান শুরু। সেই অনুসন্ধানে গিয়ে একের পর এক অজানা ঘটনার মুখোমুখি হন তিনি। রুদ্রাণীর চরিত্রের অন্যতম আকর্ষণ ইতিহাসের প্রতি তাঁর আগ্রহ। রহস্যের সূত্র খুঁজতে গিয়ে ইতিহাসের নানা তথ্য কাজে লাগান তিনি। বিপদের মুখে উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিতেও পিছপা হন না। তাঁর সঙ্গে থাকেন জীবনসঙ্গী প্রিয়ম। তাঁদের সম্পর্ক শুধু স্বামী-স্ত্রীর নয়, বন্ধুত্বেরও। তদন্তে তাঁরা একে-অপরের সহযোগী। রুদ্র-প্রিয়ম সিরিজ়ে এখনও পর্যন্ত ছ’টি বই প্রকাশিত হয়েছে। রহস্যের পাশাপাশি ইতিহাস ও তাঁদের সম্পর্কের নানা দিকও গল্পে জায়গা পেয়েছে। সেই কারণেই রুদ্রাণীর কাহিনি অন্য গোয়েন্দা গল্পের থেকে আলাদা।
কৃষ্ণার সময় থেকে রুদ্রাণীর যুগ — বাংলা সাহিত্যে মহিলা গোয়েন্দাদের চরিত্রে এসেছে নানা পরিবর্তন। কৃষ্ণার গোয়েন্দা হয়ে ওঠার পিছনে ছিল প্রতিশোধের তাগিদ। গণ্ডালুর চার কিশোরী রহস্য সমাধানের পাশাপাশি পাঠককে চিনিয়েছে বন্ধুত্বের গল্প। মিতিন মাসি সংসার সামলে অপরাধের তদন্ত করেন, আর গার্গীর গোয়েন্দাগিরির মূল শক্তি যুক্তি। অন্য দিকে, রুদ্রাণীর অভিযানে ইতিহাসের পাশাপাশি রয়েছে ব্যক্তিগত জীবনের টানাপড়েন। এই ছয় গোয়েন্দার গল্প এক রকম নয়। তাঁদের তদন্তের ধরন, জীবনের অভিজ্ঞতা ও রহস্যের প্রেক্ষাপট আলাদা। তবে একটি বিষয়ে তাঁদের মিল রয়েছে — কোনও রহস্যের সামনে তাঁরা সহজে হার মানেন না। বাংলা গোয়েন্দাসাহিত্যে দীর্ঘকাল পুরুষ গোয়েন্দাদেরই দাপট বেশি ছিল। কিন্তু কৃষ্ণা, মিতিন মাসি, গার্গী কিংবা রুদ্রাণীর মতো চরিত্র দেখিয়েছে, রহস্যের জট ছাড়াতে নারী গোয়েন্দারাও সমান দক্ষ। তাঁদের গল্পে রয়েছে রোমাঞ্চ, বুদ্ধির খেলা ও অজানাকে জানার আনন্দ। তাই বাংলা গোয়েন্দাসাহিত্যের পরিচিত জগতের বাইরে বেরিয়ে এই ছয় গোয়েন্দার কাহিনিও একবার পড়ে দেখতে পারেন।
