পাঠককে বই কেনায় উৎসাহিত করতে শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ, বইপাঠ কর্মসূচি এবং মানসম্মত প্রকাশনার পরিচিতি বাড়াতে হবে। একুশের বইমেলার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন থাকুক, আয়োজন হোক সময়োপযোগী, আর বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হয়ে উঠুক আরও গভীর। মেলা কত তারিখে শুরু হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো–মেলা কতটা পাঠকবান্ধব, কতটা প্রাণবন্ত এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখল।...
বইমেলার তারিখ বদলাতে পারে, বদলাবে না তার ঐতিহ্য। শুধু বইমেলার আয়োজন নয়, বইমেলায় পাঠকবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও অতি-আবশ্যক। ২০২৭ সালের অমর একুশে বইমেলা শুরু হচ্ছে ৭ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার। চলবে ৬ ফেব্রুয়ারি, শনিবার পর্যন্ত। বাংলা একাডেমি ১৮ অক্টোবর এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। প্রকাশক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত এই সময়সূচির প্রধান বাস্তবতা হলো পবিত্র রমজান মাস। সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৭ সালের প্রথম রোজা ৮ বা ৯ ফেব্রুয়ারি হওয়ার কথা। চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারিত হবে। ফলে বইমেলা রমজানের আগেই শেষ করার তাগিদ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ফেব্রুয়ারির প্রথম ছয় দিন মেলা চলবে। তাতে একুশের মাসের সঙ্গে বইমেলার ঐতিহাসিক সংযোগও অটুট থাকছে। এই সিদ্ধান্তকে কেবল তারিখ পরিবর্তন হিসেবে না দেখে বাস্তবতা এবং ঐতিহ্যের মধ্যে সমন্বয়ের যুক্তিযুক্ত প্রয়াস হিসেবে বিবেচনা করা ভালো।
বইমেলা তো শুধু বই কেনাবেচার আয়োজন নয়। আমাদের বইমেলা হচ্ছে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, আত্মপরিচয়ের সন্ধান, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ এবং প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের সাংস্কৃতিক সংযোগের প্রতীক। ১৯৫২ সালের ভাষাশহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে যে মেলার নামকরণ, সেই মেলা ফেব্রুয়ারির সঙ্গে সম্পর্ক নেহাতই ক্যালেন্ডারের নয়, ইতিহাস আর আবেগের। সে কারণে বইমেলার সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে সংবেদনশীলতা জরুরি। তবে ফেব্রুয়ারির প্রতি শ্রদ্ধা রক্ষার অর্থ এই নয় যে, পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক, বইমেলা ফেব্রুয়ারি মাসেই আয়োজন করতে হবে। বরং ভাষা আন্দোলনের অনুভব ধারণ করে এমন আয়োজন নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে পাঠক বইয়ের কাছে আসবেন, লেখক পাঠকের সঙ্গে মিলবেন, প্রকাশকরা নতুন বই প্রকাশে উৎসাহ পাবেন এবং সাংস্কৃতিক পরিসর হয়ে উঠবে প্রাণবন্ত।
গত কয়েক বছরে বইমেলার আয়োজন নানা অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে গেছে। মহামারি, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, জাতীয় নির্বাচন, সূচি নিয়ে মতবিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত রমজানের সঙ্গে মেলার সময়ের সংঘাত–সব মিলিয়ে আয়োজনের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। ২০২৬ সালের বইমেলার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। সাধারণত ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মেলা গত বছর শুরু হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি। শেষ হয় ১৫ মার্চ। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের এক মাসের উৎসব কার্যত ১৮ দিনের আয়োজনে পরিণত হয়। তার ওপর মেলার বড় অংশ পড়ে রমজানে। সময়সূচি নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে ৩২১টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ না নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। পরে সমঝোতার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেও প্রাথমিক অনিশ্চয়তা, প্রস্তুতির ঘাটতি এবং রমজানের বাস্তবতা মেলার স্বাভাবিক ছন্দকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর প্রভাব পড়েছিল পাঠকসমাগম, বই প্রকাশ ও বিক্রিতে। বাংলা একাডেমির সমাপনী প্রতিবেদনভিত্তিক সংবাদে ২০২৬ সালের মেলায় নতুন বই জমা পড়ার সংখ্যা ২ হাজার ৭- ২০২৫ সালে ছিল ৩ হাজার ২৯৯ এবং ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৭৫১। অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও ২০২৫ সালের ৭৮০ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৫৪৯-এ নেমে আসে। প্রকাশকদের সংগঠন প্রকাশক ঐক্যের অভিযোগ ছিল, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বিক্রি ব্যাপকভাবে কমেছে। তাদের হিসাবে প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশক স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচও তুলতে পারেননি। প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকাশকের বই বিক্রি ৫ হাজার টাকার নিচে ছিল বলেও সংগঠনটি দাবি করে। অন্যদিকে, বাংলা একাডেমির হিসাবে মেলার মোট বিক্রি প্রায় ১৭ কোটি টাকা। ফলে বিক্রির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে সংশয় নেই তা হলো প্রকাশকদের বড় অংশের অভিজ্ঞতা ছিল হতাশাজনক।
রমজানে বইমেলা আয়োজনের চ্যালেঞ্জ মূলত মানুষের সময়, যাতায়াত, দৈনন্দিন দায়িত্ব ও বাজারের বাস্তবতায়। রোজার মাসে অনেকেই ইফতারের প্রস্তুতি ও পরিবারের কাছে ফেরার তাগিদে বিকেলের দিকে দীর্ঘ সময় মেলায় থাকতে পারেন না। সন্ধ্যার পর তারাবিহ, কর্মব্যস্ততা এবং অন্যান্য দায়িত্বও পাঠকসমাগমে প্রভাব ফেলে। ২০২৬ সালের মেলায় প্রকাশকরা অভিযোগ করেছেন, যে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ে সাধারণত ক্রেতাদের ভিড় বাড়ে, রমজানে সেই সময়ের স্বাভাবিক ছন্দ থাকেনি। ফলে প্রকাশকদের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি বেড়েছে। পাঠকরাও হারিয়েছেন স্বচ্ছন্দে বই দেখা, পছন্দের লেখকের সঙ্গে কথা বলা এবং নতুন বই খুঁজে নেওয়ার সুযোগ।
এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ২০২৭ সালের সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। জানুয়ারির ৭ তারিখ থেকে ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখ–এই সময়সীমা রমজানের আগে মেলা শেষ করার পরিবেশ তৈরি করেছে। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মেলা থাকায় ভাষার মাসের সঙ্গে সম্পর্কও বজায় থাকছে। এ সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় সুফল পেতে হলে এখন প্রয়োজন সুপরিকল্পিত আয়োজন। শুধু উদ্বোধনের তারিখ ঘোষণা, স্টল বরাদ্দ কিংবা মঞ্চের অনুষ্ঠান দিয়ে জাতীয় সাংস্কৃতিক উৎসব সফল হয় না। প্রয়োজন প্রকাশকদের প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময়, সময়মতো স্টল নির্মাণ, মানসম্মত নতুন বইয়ের উপস্থিতি, কার্যকর প্রচার এবং পাঠককে মেলায় আসতে উৎসাহিত করার উদ্যোগ।
বইমেলাকে প্রাণবন্ত করতে প্রথমেই গুরুত্ব দিতে হবে পাঠকবান্ধব অবকাঠামোকে। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিস্তৃত এলাকায় হাঁটতে গিয়ে দর্শনার্থীদের যেন ধুলা, অসমান মাটি, কাদা কিংবা অস্থায়ী স্থাপনার কারণে ভোগান্তিতে পড়তে না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। চলাচলের পথ সমতল, পরিষ্কার ও নিরাপদ রাখতে হবে। বৃষ্টি হলে পানি জমে থাকা কিংবা কাদায় চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা মাথায় রেখে আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী, প্রবীণ নাগরিক এবং শিশুদের জন্য চলাচলের উপযোগী পথ এবং প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। মেলার আয়োজনে এসব বিষয়কে বাড়তি সুবিধা হিসেবে নয়, মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন শিশুচত্বরের প্রতি। বইমেলায় শিশুদের উপস্থিতি কেবল আনন্দের বিষয় নয়। এটা পাঠক তৈরিতে বিনিয়োগ। শিশুচত্বর যদি ধুলাময়, অসমান বা অপর্যাপ্তভাবে সাজানো থাকে, তাহলে শিশুদের জন্য বই দেখা ও স্বচ্ছন্দে ঘোরাফেরা কঠিন হয়ে পড়ে। শিশুচত্বরের মাটি সমান ও নিরাপদ করা, ঝুঁকিপূর্ণ অংশ সরিয়ে ফেলা, পর্যাপ্ত আলো ও বসার জায়গা রাখা এবং বয়স উপযোগী বইয়ের সুশৃঙ্খল বিন্যাস নিশ্চিত করা দরকার। শিশুদের বইয়ের সঙ্গে পরিচিত করতে গল্পপাঠ, ছড়া, চিত্রাঙ্কন, লেখক-পাঠক পরিচিতি এবং ছোটদের অংশগ্রহণমূলক আয়োজন বাড়ানো যেতে পারে। তবে এসব অনুষ্ঠান যেন বই কেনা ও পড়ার অভিজ্ঞতাকে আড়াল না করে। বরং বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে।
প্রবীণ এবং অসুস্থ দর্শনার্থীদের কথাও ভাবতে হবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটার পর কোথাও বসে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ না থাকলে অনেকেই মেলায় দীর্ঘ সময় থাকতে চান না। তাই ছায়াযুক্ত স্থানে পর্যাপ্ত বেঞ্চ, বিশ্রামাগার এবং সহজে খুঁজে পাওয়া যায় এমন পানির ব্যবস্থা প্রয়োজন। নিরাপদ পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ, পরিষ্কার শৌচাগার, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা মেলার মৌলিক সুবিধার অংশ হতে হবে। জনসমাগমের চাপ বিবেচনায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, নির্দেশনামূলক চিহ্ন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থাও কার্যকর রাখতে হবে।
মেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খাবারের দোকান ও রেস্টুরেন্টের সংখ্যা এবং বিন্যাস। বইমেলায় খাবারের ব্যবস্থা থাকবে–এটা স্বাভাবিক। দীর্ঘ সময় ধরে ঘুরে বেড়ানো দর্শনার্থীদের জন্য হালকা খাবার ও পানীয়ের প্রয়োজন আছে। কিন্তু খাবারের দোকান যদি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জায়গা দখল করে, বইয়ের স্টল ও পাঠকের চলাচলের জায়গা সংকুচিত করে ফেলে কিংবা মেলার পরিবেশে অপ্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক চাপ সৃষ্টি করে, তবে তা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। খাবারের দোকানের সংখ্যা, অবস্থান ও আয়তন নির্ধারণে প্রয়োজন, পরিচ্ছন্নতা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং জনচলাচলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বইমেলার মূল আকর্ষণ যেন বই-ই থাকে। খাবারের দোকান হবে সহায়ক, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
পাঠককে মেলায় আনতে প্রচার ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচিরও নতুন পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোন প্রকাশনী কী নতুন বই আনছে, কোন লেখকের বই প্রকাশিত হচ্ছে, কোন বিষয়ে আলোচনা বা বই পরিচিতির আয়োজন আছে–এসব তথ্য আগেভাগে সহজলভ্য করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাঠাগার, বইপাঠের সংগঠন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে পাঠকসমাগম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার। তবে মেলার সফলতা শুধু দর্শনার্থীর সংখ্যা দিয়ে মাপলে চলবে না। কত মানুষ বই কিনলেন, নতুন পাঠক তৈরি হলো কি না, শিশু-কিশোররা বইয়ের প্রতি আগ্রহী হচ্ছে কি না, নতুন লেখক ও প্রকাশকরা জায়গা পেলেন কি না–এসবও বিবেচনায় রাখতে হবে।
এখানে বাংলা একাডেমির দায়িত্ব যেমন আছে, তেমনি প্রকাশক, লেখক, পাঠক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরও ভূমিকা আছে। মেলার পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় প্রকাশকদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো, ছোট ও মাঝারি প্রকাশকদের স্বার্থ রক্ষা, স্টল বরাদ্দে স্বচ্ছতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। প্রকাশকদের আর্থিক ঝুঁকি কমাতে সময়সূচি যথাসময়ে ঘোষণা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পাঠককে বই কেনায় উৎসাহিত করতে শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ, বইপাঠ কর্মসূচি এবং মানসম্মত প্রকাশনার পরিচিতি বাড়াতে হবে।
একুশের বইমেলার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন থাকুক, আয়োজন হোক সময়োপযোগী, আর বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হয়ে উঠুক আরও গভীর। মেলা কত তারিখে শুরু হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো–মেলা কতটা পাঠকবান্ধব, কতটা প্রাণবন্ত এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখল।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
