খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চতুরতার সঙ্গে ছড়িয়ে দেওয়া হলো একটি কাটছাঁট করা অডিও রেকর্ড। মুহূর্তের মধ্যেই শুরু হলো ফেসবুক লাইভ, ডেকে আনা হলো ক্ষুব্ধ জনতাকে। সত্যতা যাচাই কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে শুরু হলো নির্মম পিটুনি। সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক ব্যক্তির মর্মান্তিক পরিণতি এই সহিংসতার সর্বশেষ একটি উদাহরণ। অন্যদিকে, ঢাকার ধামরাইয়ে একাধিক মোটরসাইকেলে চেপে এসে পথরোধপূর্বক তুলে নিয়ে হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে এক রাজনৈতিক কর্মীর।
আইন ও বিচার বিভাগ থাকলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চুরি, ছিনতাই, ধর্ম অবমাননা, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতাকে কেন্দ্র করে একের পর এক ঘটছে সংঘবদ্ধ হামলা ও ‘মব জাস্টিস’-এর নামে নৃসংসতা। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান বলছে, ঘটনাগুলোকে ঢালাওভাবে ‘উত্তেজিত জনতা’ বা ‘মব’ আখ্যা দিয়ে নেপথ্যের প্রকৃত পরিকল্পনাকারী, উসকানিদাতা ও অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
৯ মাসে ১৭১ মৃত্যু, তিন মাসে ১৩৭ ঘটনা: মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে সারা দেশে গণপিটুনিতে অন্তত ১৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৬৩ জন, চট্টগ্রামে ৩৯ জন এবং খুলনা বিভাগে ২২ জন মারা গেছেন।
অপরদিকে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের প্রতিবেদনে জানা গেছে, এ সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির অন্তত ১৩৭টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ৫৪ জন নিহত ও ১৪৫ জন মারাত্মক আহত হয়েছেন।
অনলাইন উসকানি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভয়াবহতা: সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীম হত্যার ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি তুচ্ছ পারিবারিক বিবাদ ও অডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে ফজলুল হক নামের এক ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে এসে তথাকথিত ‘তৌহিদী জনতা’কে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর নিদারুণ পিটুনির শিকার হয়ে শামীম গুরুতর অসুস্থ হলে এমনকি হাসপাতালে নেওয়া এবং চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও তার ওপর একাধিকবার হামলা চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি প্রাণ হারান।
এ ঘটনার পরপরই ধামরাইয়ে ছাত্রদল নেতা মাহফুজুর রহমান ইমনের ওপর একাধিক মোটরসাইকেলযোগে এসে ২০-২৫ জন লোক হামলা চালায়। সেখানেও ব্যক্তিগত আক্রোশকে আড়াল করতে মাদক কিংবা অন্য অভিযোগ তোলার চেষ্টা চলে।
‘মব’ তকমায় অপরাধ লঘু করার সুযোগ নেই: অতিরিক্ত আইজিপি: সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) সায়েদুর রহমান বলেন, “পরিকল্পিতভাবে কাউকে হত্যা বা আঘাত করে সেটিকে ঢালাওভাবে ‘মব সহিংসতা’ বলে অপরাধের গুরুত্ব কমিয়ে দেখার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধের প্রকৃত ধরন অনুযায়ী মামলা তদন্ত করে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। সরকার বা যেকোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কেউ জড়িত থাকলেও ছাড় দেওয়া হবে না।”
বিপুলসংখ্যক মানুষ একসাথে আইন হাতে তুলে নিলে পুলিশের তাৎক্ষণিক প্রতিরোধে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি প্রতিরোধে সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের সক্ষমতা আরও জোরদার করা হচ্ছে।
আইনের শাসন ও সামাজিক আস্থার সংকট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক এবং এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম মনে করেন, বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট ও সমাজে সহনশীলতা কমে যাওয়ার কারণেই মব সহিংসতার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধীদের বিচারে কেবল ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো বা মামলা করাই শেষ কথা হতে পারে না। জনতা জড়ো করার নেপথ্য উসকানিদাতা, ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে ছড়িয়ে দেওয়া গুজব এবং রাজনৈতিক চক্রান্তকে গভীর তদন্তের আওতায় এনে কঠোর বিচার নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
