রাজধানী নিরাপদ রাখা এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে রক্ষা করা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান ও নজরদারির মুখে মাদক কারবারিরা যখন আস্তানা বদলে ফেলছে, তখন তাদের অপরাধের বিস্তার তো থামছেই না, উল্টো কৌশল বদলে পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের ঘরের দরজায়। একসময় রাজধানীর চিহ্নিত মাদক স্পটগুলো ছিল কারবারিদের প্রধান ভরসা। এখন সেই প্রকাশ্য বেচাকেনার জায়গা দখল করছে হোম ডেলিভারি, কুরিয়ার পার্সেল এবং ছদ্মবেশী পরিবহনের আড়ালে গড়ে ওঠা সরবরাহব্যবস্থা। এটি শুধু মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ নয়, নগরীর সামাজিক নিরাপত্তা ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে কারবারিদের দৃশ্যমান উপস্থিতি কমে আসা ইতিবাচক। কিন্তু প্রকাশ্য স্পটে জটলা কমলেই মাদক ব্যবসা কমেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বুধবার রূপালী বাংলাদেশের বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসা বিভিন্ন অভিযানের ঘটনা থেকে স্পষ্ট, মাদক কারবারিরা পণ্য পরিবহন ও সরবরাহের প্রচলিত ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। কুরিয়ার পার্সেল, পণ্যবাহী যানবাহন, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা সাধারণ ডেলিভারি ব্যবস্থায় ঘরের দরজায় পৌঁছে যাচ্ছে মাদক; যা রীতিমতো উদ্বেগের।
আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে প্রথমেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে চালান উদ্ধার কিংবা কয়েকজন বাহককে গ্রেপ্তার করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। মাদকের উৎস, অর্থের জোগান, পরিবহনব্যবস্থা, গুদাম, বিতরণকারী এবং পেছনে থাকা মূল পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করতে হবে।
কুরিয়ার ও পার্সেল সেবার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন ঝুঁকিভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থা। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয় যাচাই, সন্দেহজনক চালান শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংরক্ষণ এবং আইনসম্মতভাবে তদন্তকারী সংস্থাকে তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
মাদকবিরোধী কার্যক্রমের সাফল্য কেবল গ্রেপ্তার বা জব্দ করা মাদকের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। কোন এলাকায় মাদকের সরবরাহ কমেছে, পুনরায় অপরাধে জড়ানোর হার কতটা কমেছে এবং বড় সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এরও মূল্যায়ন দরকার। এ জন্য নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা, জবাবদিহি এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে স্বাধীন মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও স্থানীয় সমাজকে সম্পৃক্ত করে তরুণদের মধ্যে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে দূরে ঠেলে না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে। কারণ সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি মাদকের চাহিদা কমানো না গেলে অপরাধীচক্র নতুন বাজার তৈরির সুযোগ পাবে।
রাজধানীকে মাদকের অদৃশ্য নেটওয়ার্কের কাছে জিম্মি হতে দেওয়া যায় না। এ জন্য প্রয়োজন সাময়িক অভিযাননির্ভর তৎপরতার বদলে তথ্যভিত্তিক, প্রযুক্তিসমর্থিত ও সমন্বিত ব্যবস্থা। মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তি, অর্থদাতা কিংবা পৃষ্ঠপোষকÑ পরিচয় যা-ই হোক, কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা চলবে না। সরকারের উচিত নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা। মাদকের হোম ডেলিভারি বন্ধ করতে হলে শুধু বাহকের হাত থেকে চালান উদ্ধার করলেই হবে না; ভাঙতে হবে অর্থ, পৃষ্ঠপোষকতা ও সরবরাহের পুরো চক্র। আইনের কঠোর প্রয়োগ, কার্যকর প্রতিরোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের সমন্বয়েই রাজধানীকে মাদকের বিস্তার থেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।