কালবেলা · সাধারণ
ট্রমা জয় করে অনন্য শিক্ষক আকলিমা, হুইলচেয়ারে বসেই গড়ছেন শত শিশুর ভবিষ্যৎ
১৭/১০/২০২৬

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে চলছে ইংরেজি ক্লাস। শিক্ষার্থীদের কেউ বই খুলে মনোযোগ দিয়ে শুনছে, কেউ আবার খাতায় লিখছে। আর হুইলচেয়ারে বসে একের পর এক প্রশ্ন করে শিশুদের পাঠ বুঝিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষক মোছা. আকলিমা খাতুন।
কখনো হুইলচেয়ার ঠেলে এক বেঞ্চ থেকে আরেক বেঞ্চে যাচ্ছেন, কোনো শিক্ষার্থীর খাতা হাতে নিয়ে দেখছেন বাড়ির কাজ ঠিকমতো করেছে কি না। আবার হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে গিয়ে লিখে দিচ্ছেন নতুন কোনো শব্দ বা বাক্য।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, আর দশজন শিক্ষকের মতোই স্বাভাবিক একটি কর্মদিবস কাটাচ্ছেন আকলিমা। অথচ এই স্বাভাবিকতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, দুর্ঘটনায় বদলে যাওয়া জীবন এবং ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প।
২০০৬ সালের ৫ মার্চ মেহেরপুর সরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়তেন আকলিমা। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে গাংনী উপজেলার বাঁশবাড়িয়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। দুর্ঘটনায় কোমর থেকে নিচের অংশের স্বাভাবিক চলাচলের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। মুহূর্তেই থমকে যায় জীবনের গতিপথ। অনিশ্চিত হয়ে পড়ে পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার স্বপ্ন।
কিন্তু জীবনকে থামতে দেননি আকলিমা। দীর্ঘ চিকিৎসা, পুনর্বাসন, পরিবারের সহযোগিতা ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সম্বল করে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। হুইলচেয়ারে বসেই চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা, যোগ দিয়েছেন শিক্ষকতা পেশায়। এখন পাঠদান, বিদ্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) সংক্রান্ত কাজ, সংসার ও সন্তানকে সামলে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ছেন এই শিক্ষিকা।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে ফিরে পান ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার রায়পুর গ্রামের কৃষক মৃত জোয়াদ আলী মোল্লার মেয়ে আকলিমা। দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার জন্য একের পর এক জায়গায় ছুটেছেন তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসাতেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা নেন সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজডে (সিআরপি)।
সেখানেই ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে তার জীবনের গল্প। সিআরপির স্বেচ্ছাসেবীদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি নিজের ভেতরের শক্তিটাও যেন নতুন করে খুঁজে পান আকলিমা। এ সময় পরিবারের সদস্যরাও সব সময় তার পাশে ছিলেন।
শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে মেনে না নিয়ে নতুন করে পথচলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। হুইলচেয়ার হয়ে ওঠে তার চলার সঙ্গী, কিন্তু থেমে যায়নি স্বপ্ন।
প্রতিকূলতা জয় করে শিক্ষকতা পেশায়
দীর্ঘ সংগ্রামের পর পড়াশোনা শেষ করে ২০১০ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন আকলিমা। কর্মজীবনের শুরুতে ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গাংনী উপজেলার বানিয়াপুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পরে ২০১৫ সালে রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেই থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টির শিশুদের পাঠদান করে আসছেন তিনি।
আকলিমার দিন শুরু হয় অন্য অনেক মানুষের মতোই। পার্থক্য শুধু, তাকে প্রতিটি কাজ করতে হয় হুইলচেয়ারে বসে। শ্রেণিকক্ষে যাওয়া, শিক্ষার্থীদের খাতা দেখা, ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা কিংবা আইসিটি-সংক্রান্ত কাজ সবই তিনি করেন নিজের মতো করে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আকলিমা বিদ্যালয়ের আইসিটি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি ইংরেজি ক্লাস নেন। প্রয়োজন হলে অন্য শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে গণিতসহ অন্যান্য বিষয়ও পড়ান তিনি।
রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ফৌজিয়ারা খাতুন কালবেলাকে বলেন, ২০১৯ সালে তিনি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে আকলিমাকে অন্য শিক্ষকদের চেয়ে আলাদা করে দেখেননি। বরং তার দায়িত্ব পালনের নিষ্ঠা ও কাজের প্রতি আন্তরিকতা তাকে মুগ্ধ করেছে।
ফৌজিয়ারা খাতুন বলেন, ‘শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে হুইলচেয়ারে বসেও আকলিমা অন্যদের চেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করেন। বিদ্যালয়ের আইসিটি-সংক্রান্ত কাজেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বরং বর্তমানে অন্য অনেক শিক্ষকের তুলনায় আকলিমার ওপরই আমি বেশি নির্ভর করি।’
শিক্ষার্থীদের কাছে ‘আকলি ম্যাডাম’
সহকর্মীদের কাছে দায়িত্বশীল শিক্ষক আকলিমা শিক্ষার্থীদের কাছেও ভীষণ প্রিয়। তাদের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, আপনজনের মতো।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী জাকিয়া বলে, ‘আমরা আকলিমা ম্যাডামকে আদর করে “আকলি ম্যাডাম” বলে ডাকি। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি আমাদের ইংরেজি পড়ান।’
আকলিমা ম্যাডাম খুব যত্ন নিয়ে পড়ান বলেও জানায় জাকিয়া। একই কথা জানায় পঞ্চম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী আব্দুল জব্বার।
সম্প্রতি বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হুইলচেয়ারে বসেই এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যাচ্ছেন আকলিমা। কখনো শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে খাতা দেখছেন, কখনো ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছেন। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন দায়িত্ব, সবই সামলাচ্ছেন নিজের মতো করে। শারীরিক সীমাবদ্ধতা তার চলার গতি কমিয়েছে, কিন্তু দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি রাখতে দেননি নিজেকে।
সংসার ও সন্তান সামলেও দেখেন ভবিষ্যতের স্বপ্ন
দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যেই নিজের সংসার গড়েছেন আকলিমা। তার একটি ছেলে রয়েছে, নাম আদনান মাহমুদ আলী। মায়ের কর্মস্থল রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে সে।
শিক্ষকতার পাশাপাশি সংসার সামলানো এবং সন্তানকে বড় করে তোলার দায়িত্বও পালন করছেন আকলিমা। তার স্বপ্ন, ছেলে আদনান মাহমুদ আলীকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। একইসঙ্গে নিজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চান তিনি।
আকলিমা চান, নিজের কাজ নিজেই করতে। কারও ওপর বোঝা হয়ে বাঁচতে চান না। শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের জন্য কাজ করে যেতে চান।
আকলিমা খাতুন কালবেলাকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর জীবনটা অনেক কঠিন হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েও যখন হাঁটতে পারিনি, তখন অনেকবার ভেঙে পড়েছি। কিন্তু পরিবার, সিআরপির সহযোগিতা আর নিজের ইচ্ছাশক্তি আমাকে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজ হুইলচেয়ারে বসেই আমি শিশুদের পড়াই, নিজের দায়িত্ব পালন করি। আমার শিক্ষার্থীদের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। আমি কারও ওপর নির্ভরশীল হতে চাই না। নিজের কাজ নিজে করে যেতে চাই। আর আমার স্বপ্ন, আমার ছেলে ও আমার শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।’
ট্রমার ক্ষত পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
আজ ১৭ অক্টোবর বিশ্ব ট্রমা দিবস। সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, সহিংসতা ও অন্যান্য আঘাতজনিত কারণে মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি এ দিবসের অন্যতম লক্ষ্য। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির দ্রুত চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ নিশ্চিত করার গুরুত্বও তুলে ধরা হয় এ দিনে।
আকলিমার জীবনসংগ্রাম দুর্ঘটনাজনিত গুরুতর আঘাতের পর চিকিৎসা, পুনর্বাসন, পারিবারিক সহযোগিতা এবং কর্মক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তির গুরুত্ব সামনে নিয়ে আসে। দুর্ঘটনার পর শারীরিক সক্ষমতায় পরিবর্তন এলেও উপযুক্ত চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সহযোগিতা একজন মানুষকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষা, কর্মজীবন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখার সুযোগ করে দিতে পারে।
মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের মেডিকেল অফিসার সাউদ কবির মালিক কালবেলাকে বলেন, ‘আঘাতের ধরন ও ক্ষতির মাত্রাভেদে চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের প্রয়োজন ভিন্ন হয়। তাই দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।’
আকলিমার গল্প শুধু একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষকের জীবনসংগ্রামের গল্প নয়। এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা, কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার প্রমাণ রাখা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য স্বপ্ন দেখার গল্প।
জীবন তাকে থামিয়ে দেওয়ার অনেক কারণ দেখিয়েছে। কিন্তু আকলিমা বেছে নিয়েছেন এগিয়ে যাওয়ার পথ। আজ রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে হুইলচেয়ারে বসে শিশুদের পাঠদান করতে করতে তিনি যেন প্রতিদিনই নীরবে একটি শিক্ষা দিয়ে চলেছেন, শরীরের সীমাবদ্ধতা জীবনের পথ কঠিন করতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাকে থামিয়ে দিতে পারে না।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗