বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় তার আখড়াবাড়িতে তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসব শুরু হয়েছে। এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে মাজার প্রাঙ্গণে বসেছে সাধুর হাট।
আজ (শনিবার) থেকে আগামী সোমবার পর্যন্ত নানা অনুষ্ঠান পালিত হবে। ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি বর্তমানে দেশ-বিদেশের সাধু-গুরু, বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
সভ্যতার এই ব্যস্ত যুগেও মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সাধুরা সাঁইজির ধর্মদর্শনের চিরাচরিত বাণীÑ ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’ এবং ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’Ñ খ-ে খ- গেয়ে চলেছেন। তাদের চরণধূলিতে এখন সিক্ত বাউল সম্রাটের আখড়াবাড়ি।
ইতোমধ্যে মাজারের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে বাউল সাধকরা গেয়ে চলেছেন সাঁইজির আধ্যাত্মিক মর্মবাণী ও ভেদ তথ্যের গান। সত্য ও সুপথের সন্ধানে এবং মানবতার দীক্ষা নিতে আত্মার টানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা দলে দলে এসে আসন গেড়েছেন সাঁইজির মাজারে। তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনে লালনমেলা, আলোচনা সভা ও লালন সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
জানা যায়, ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর নির্মম অত্যাচারে যখন মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, ঠিক সেই সময়ে সত্যের পথ ও মানুষের গুরুর দীক্ষা দিতে মানবতাবাদী সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের আবির্ভাব ঘটে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায়। লালনের জন্মস্থান নিয়ে নানাজনের নানা মত থাকলেও তার জন্মরহস্য আজও অজানা। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন এবং আর্থিক অসংগতির কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ না করলেও ছিলেন স্বশিক্ষিত।
যৌবনকালে পুণ্যলাভের জন্য তীর্থভ্রমণে বেরিয়ে তার জীবনধারায় পরিবর্তন আসে। তীর্থকালে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে সঙ্গীরা তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। পরে মলম শাহের আশ্রয়ে জীবন ফিরে পাওয়ার পর সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সান্নিধ্যে তিনি সাধক ফকিরি লাভ করেন। ভক্ত মলম শাহের দান করা ১৬ বিঘা জমিতে ১৮২৩ সালে লালন আখড়া গড়ে ওঠে। প্রথমে সেখানে লালনের বসবাস ও সাধনার জন্য বড় খড়ের ঘর তৈরি করা হয়, যেখানে তার সাধন-ভজন বসত।
ছেঁউড়িয়ায় আখড়া স্থাপনের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি শিষ্য-ভক্তদের নিয়ে পরিবৃত ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি প্রায় এক হাজার গান রচনা করে গেছেন। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর (১ কার্তিক) ভোরে এই মরমি সাধক দেহত্যাগ করেন এবং তার সাধন-ভজনের ঘরের মধ্যেই তাকে সমাহিত করা হয়।
