ভোরের আলো ফুটতেই গ্রামের কোনো বাড়ির উঠানে জ্বলে উঠত চুলা। পাশে রাখা থাকত গরম বালু, চাল আর মুড়ি ভাজার সরঞ্জাম। আগুনের তাপে গরম বালুর মধ্যে চাল ছেড়ে দক্ষ হাতে মুড়ি তৈরি করতেন কারিগররা। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ত ভাজা মুড়ির মিষ্টি গন্ধ। শিশুদের কৌতূহলী চোখ আর বাড়ির মানুষের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠত উঠান। গ্রামবাংলার সেই পরিচিত দৃশ্য এখন ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
একসময় গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল মুড়ি ভাজার এই প্রাচীন পদ্ধতি। বাড়িতে অতিথি এলে মুড়ি, নারকেল, গুড় কিংবা পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে মাখা খাওয়ার চল ছিল। কৃষকের মাঠের কাজের ফাঁকে, হাটে কিংবা বিকেলের আড্ডায় মুড়ি ছিল সহজলভ্য নাশতা। অনেক পরিবার মুড়ি ভেজে জীবিকাও নির্বাহ করত।
প্রাচীন এই পদ্ধতিতে মুড়ি তৈরি সহজ কাজ নয়। চালের অবস্থা ও বালুর তাপ বুঝে দ্রুত হাতে কাজ করতে হয়। অভিজ্ঞতা না থাকলে ভালো মুড়ি তৈরি করা কঠিন। কিন্তু আধুনিক যন্ত্রে উৎপাদিত মুড়ির প্রসার, শ্রমসাধ্য কাজ এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এই পদ্ধতি।
গ্রামের প্রবীন গৃহিণী নুরজাহান বেগম বলেন, “আগে বাড়ির আশপাশেই মুড়ি ভাজার দৃশ্য দেখা যেত। গরম গরম মুড়ি হাতে পেলে অন্য রকম আনন্দ লাগত। এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। আমাদের ছেলেমেয়েরা এসব কাজের সঙ্গে পরিচিতও হচ্ছে না।”
মুড়ি শুধু খাবার নয়, গ্রামবাংলার জীবনযাত্রা ও লোকজ সংস্কৃতিরও একটি অংশ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ নারীর শ্রম, পারিবারিক জীবনের স্মৃতি আর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস।
স্থানীয়ভাবে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ, কারিগরদের সহায়তা এবং নতুন প্রজন্মকে এ পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করার উদ্যোগ নেওয়া গেলে হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। নইলে একদিন গরম বালুতে মুড়ি ভাজার দৃশ্য হয়তো শুধু প্রবীণদের স্মৃতিতেই বেঁচে থাকবে।
