Published on
:
2 min read
চার দিনের আনন্দ শেষে ঢাকের আওয়াজে বাজছে বিষাদের সুর। ঘরের মেয়ে উমাকে বিদায় জানাতে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী টাকির রাজবাড়িতে। উত্তর ২৪ পরগনার টাকির ৩০৭ বছরের প্রাচীন পুবের বাড়িতে এখন দেবী দুর্গার বিদায়পর্ব ঘিরে তুঙ্গে প্রস্তুতি। শতাব্দীর প্রাচীন পারিবারিক পরম্পরা মেনেই উমাকে কৈলাসে ফেরানোর আয়োজন করছেন পরিবারের সদস্যরা। সময়ের স্রোতে বহু কিছু বদলালেও পূর্বপুরুষদের স্মৃতি এবং প্রাচীন রীতিনীতির টান আজও এখানে অমলিন।
পুবের বাড়ির বিদায়লগ্নের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ দেবীর বিশেষ ভোগ ও প্রাচীন রীতি। চিরাচরিত পারিবারিক প্রথা মেনে বিদায়বেলায় দেবীকে পান্তা ভাত ও কচুশাক নিবেদন করা হয়। বাঙালির চেনা গ্রামীণ খাবারের এই ছোঁয়া পুজোর শেষ পর্বে এক অনন্য মাত্রা যোগ করে। এর পরে শুরু হয় জমজমাট সিঁদুর খেলা। সিঁদুরের লাল রঙে রাঙিয়ে মঙ্গলযাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এর পরেই দেখা মেলে পুবের বাড়ির সবচেয়ে স্বতন্ত্র ঐতিহ্যের। মোট ২৪ জন বেহারার কাঁধে চেপে ঠাকুরদালান থেকে বের হন মা দুর্গা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই নিয়মেই উমার কৈলাসযাত্রা সম্পন্ন হয়।
পুবের বাড়ির এই দুর্গোৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অবিভক্ত বাংলার স্মৃতি। এক সময় বাংলার নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এই ঠাকুরদালানে এসে ভিড় জমাতেন। দেশ ভাগের পর সীমানা আলাদা হয়ে গেলেও পুজোর টান এতটুকুও কমেনি। আজও রাজ্যের বিভিন্ন জেলা, ভিনরাজ্য এমনকি বিদেশ থেকেও মানুষ এই রাজবাড়ির পুজো দেখতে ছুটে আসেন। ইতিহাস, পারিবারিক ঐতিহ্য ও প্রাচীন আচারকে খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করতেই দর্শনার্থীদের এই ভিড় জমে।
টাকি মানেই সীমান্ত নদী ইছামতি, আর ইছামতী মানেই দুই বাংলার সংস্কৃতির অটুট মেলবন্ধন। নদীর এক পারে ভারত এবং অন্য পারে বাংলাদেশ। মাঝে আন্তর্জাতিক সীমান্ত থাকলেও ভাষা ও ঐতিহ্যের বাঁধন আজও দুই পারের মানুষকে মিলিয়ে দেয়। পুবের বাড়ির দুর্গোৎসব ও বিসর্জন তাই আর পাঁচটা পারিবারিক পুজোর গণ্ডিতে আটকে নেই। এটি হয়ে উঠেছে সীমান্ত বাংলার ইতিহাস ও আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মায়ের বিদায়ে ভক্তদের চোখে জল এলেও মনে রয়ে যায় আগামী বছরের অপেক্ষা। ঠাকুরদালানের বিষাদের সুরেই শেষ পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হয় বাঙালির চিরন্তন প্রার্থনা—‘আসছে বছর আবার হবে।’