চলতি বছরে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রোগীদের ৭৯ শতাংশই নারী ও শিশু। অপরদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৫ হাজার ৪৫৫ জনের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর আক্রান্ত ও মৃত্যু হার বাড়লেও অক্টোবরে এসেও সেই চিত্র বদলায়নি। চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনে আক্রান্ত ৯৮৯ জনে পৌঁছেছে, অথচ ২০২৫ সালে পুরো মাসে এ সংখ্যা ছিল ৯৯০ জন। সে হিসেবে মাসে বাকি দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা সেপ্টেম্বরকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে নগরবাসী কঠিন পরিস্থিত পার করলেও সিটি কর্পোরেশনের বলছে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের দাবি, ফগিং কার্যক্রম আধুনিকায়ন করা হয়েছে। ফগিং করার ৭২ ঘণ্টা পর মশা করছে। ওষুধও ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতেও মশা মরছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ২৪ জনের মধ্যে ১২ জন নারী ও সাত জন শিশু। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৬১১ জন, নারী ১ হাজার ৫৮৭ জন এবং শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ২৫৭।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তবে বয়স, রোগের তীব্রতা, অন্যান্য শারীরিক জটিলতা ও চিকিৎসা নেওয়ার সময়-সংক্রান্ত তথ্য ছাড়া এই ব্যবধানের কারণ নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
সেপ্টেম্বরেই ১৬ জনের মৃত্যু
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর মাসভিত্তিক হিসাবেও উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৬৮ জন আক্রান্ত হওয়ার পর ফেব্রুয়ারিতে আক্রান্তের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২২ জনে। আর মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে মাসে ৩৭ এবং জুনে ১২২ জন আক্রান্ত হন।
জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয় ৫৩৬। আগস্টে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২০২ জনে। সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে ২ হাজার ৪৩০ জনে পৌঁছায়। অক্টোবরের প্রথম ১১ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ৯৮৯ জন। অর্থাৎ মোট আক্রান্তের প্রায় ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশই শনাক্ত হয়েছেন সেপ্টেম্বরে।
মৃত্যুর হিসাবেও সেপ্টেম্বর ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ওই মাসে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা বছরের মোট মৃত্যুর দুই-তৃতীয়াংশ। অক্টোবরের প্রথম ১০ দিনে মারা গেছেন আরও তিনজন।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে একজন এবং জুলাই ও আগস্টে দুজন করে মারা যান। জানুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল, মে ও জুনে ২০২৬ সালের হিসাবে কোনো মৃত্যুর তথ্য দেখানো হয়নি।
অক্টোবরেও কমেনি রোগীর চাপ
১১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৯৬ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৪ জন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি) ১০ জন, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ১৩ জন, সিএমএইচ চট্টগ্রামে তিনজন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ২০ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ১৬ জন ভর্তি হয়েছেন।
প্রতিবেদনে একই সময়ে একজনের মৃত্যুর তথ্যও রয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪ জনে।
বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৪ হাজার ৪৫৫ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ১ হাজার রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫ হাজার ১৯৭ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন। ১১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৫৮ জন।
সীতাকুণ্ডে সবচেয়ে বেশি রোগী
এখনও পর্যন্ত উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে সীতাকুণ্ডে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৬৯৫ জন। এরপর কর্ণফুলীতে ২৯৫, বাঁশখালীতে ১৭৩, রাঙ্গুনিয়ায় ১৬২, সাতকানিয়ায় ১৩৩ এবং আনোয়ারায় ১২৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
এছাড়া পটিয়ায় ১১৩, রাউজানে ১১১, হাটহাজারীতে ৮৮, চন্দনাইশে ৮৭, মিরসরাইয়ে ৯১, বোয়ালখালীতে ৮৩, লোহাগাড়ায় ৭০, ফটিকছড়িতে ৫৪ এবং সন্দ্বীপে ৩৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন। তালিকাভুক্ত ১৫টি উপজেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৩১৪।
উপজেলাগুলোর মধ্যে সীতাকুণ্ডে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উপজেলার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গুর বিস্তার ও প্রতিরোধ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে আলাদা নজরদারির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে, বলছে সিটি কর্পোরেশন
পরিস্থিতি গত দুই মাসে উদ্বেগজনকভাবে অবনতি হলেও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শামীম মো. খান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ভয়ঙ্কর সেপ্টেম্বরের পর অক্টোবরে দাঁড়িয়ে আসলে আত্মতুষ্টির জায়গা নেই। আমরা চেষ্টা করছি। বর্তমানে ফগিং স্টাইলে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। ফগিং করার পর মশা ৭২ ঘণ্টা পর মারা যাবে। আর এখন ওষুধটি ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতেও মশা মরছে। তবে এটুকু আমরা বলতে পারি, ডেঙ্গু এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
আইএমই/ডিজে
