বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজার। নীল জলরাশি আর বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা দেখতে প্রতিবছর এখানে আসেন লাখো পর্যটক। কিন্তু সৈকতে বসে নির্বিঘ্নে সমুদ্র উপভোগ করাটাই অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। হকারদের অনবরত পণ্য কেনার অনুরোধ, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত লাইফগার্ডের অভাব, নিরাপত্তাশঙ্কা এবং আবাসন ব্যয় নিয়ে অভিযোগ রয়েছে পর্যটকদের। তাঁদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অব্যবস্থাপনায় ম্লান হচ্ছে দেশের অন্যতম প্রধান এই পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্য।
বগুড়া থেকে বেড়াতে আসা পলাশ মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রী লুপনা সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়িতে ছাতার নিচে বসে সমুদ্র উপভোগ করছিলেন। ওই সময় তাঁদের সামনে ধারণ করা চার মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একে একে ২৭ জন হকার পণ্য বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছেন। সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে এমন অভিজ্ঞতায় বিরক্ত এই দম্পতি।
পলাশ মাহমুদ বলেন, ‘চার-পাঁচ সেকেন্ড পরপরই হকাররা এসে বিভিন্ন পণ্য কেনার জন্য অনুরোধ করছেন। আমরা মূলত এখানে আসি একটু আনন্দ করতে, মানসিক প্রশান্তি পেতে এবং সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিন্তু হকারদের অতিরিক্ত আনাগোনার কারণে সেই আনন্দ অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে।’
লুপনার অভিজ্ঞতাও একই রকম। তিনি বলেন, রাতে সৈকতে ঘুরতে গিয়ে প্রতি মিনিটে ১২-১৫ জন বা তারও বেশি হকারকে পণ্য কেনার অনুরোধ জানাতে দেখেছেন। এতে স্বস্তিতে সময় কাটানো কঠিন হয়ে পড়ে, ব্যাহত হয় সৈকতের পরিচ্ছন্নতাও। ২০০৬ সালে কক্সবাজারে এসে যে পরিবেশ দেখেছিলেন, তার অনেক পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
শুধু এই দম্পতিই নন, সৈকতে আসা অনেক পর্যটকের অভিযোগ, কক্সবাজারে বেড়াতে এসে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি মিলছে না। সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা, হোটেলের বর্জ্য ও পলিথিনের দূষণ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব এবং অতিরিক্ত খরচ তাঁদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও মনে করছেন, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন।
হকারের চাপ, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
সৈকতে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড না থাকার অভিযোগ করেছেন পর্যটক রবিন আহমেদ। তাঁর ভাষ্য, হকারদের অতিরিক্ত আনাগোনার কারণে পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
পর্যটক হাবিবুর রহমানের অভিযোগ, সৈকতসংলগ্ন এলাকায় হোটেলগুলো অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। এসব হোটেলের বর্জ্য, পলিথিন ও অন্যান্য আবর্জনা সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে, যা সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য হুমকি।
আবাসন ব্যয় নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে পর্যটকদের মধ্যে। আজিজুল হক বলেন, ভালো পরিবেশে থাকার মতো সাশ্রয়ী হোটেল পাওয়া কঠিন। তুলনামূলক কম ভাড়ার হোটেলগুলোতে আবার পরিবেশ ও মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিমানভাড়ার ঘন ঘন পরিবর্তনও ভ্রমণের পরিকল্পনা ও বাজেটে প্রভাব ফেলছে বলে জানান চিকিৎসক ইয়াহিয়া খান। তাঁর মতে, একদিনের ব্যবধানে ভাড়া বদলে গেলে পর্যটকদের ভ্রমণ ব্যয় হিসাব করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছেন শিহাবুর রহমান। তাঁর মতে, দূরদূরান্ত থেকে বেড়াতে আসা পর্যটকদের স্থানীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে আগে থেকে জানার সুযোগ সীমিত। তাই পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা জান্নাতুল মাওয়ার অভিযোগ, সৈকতের অপরিচ্ছন্নতা ও হকারদের আনাগোনায় স্বস্তিতে সময় কাটানো যায় না। ভেজা অবস্থায় শিশুদের নিয়ে সৈকত থেকে ফেরার সময় নারী ও শিশুদের জন্য চেঞ্জিং রুম, পর্যাপ্ত ছাউনি বা আশ্রয়ের ব্যবস্থাও নেই।
হকারের সংখ্যা ও দৌরাত্ম্য বাড়ছে কেন?
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী-এই তিনটি পয়েন্টে সহস্রাধিক হকারের বিচরণ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই স্থানীয় বাসিন্দা নন বলে দাবি জেলা প্রশাসনের বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির (বিএমসিএফ) সংশ্লিষ্টদের। ২০২৪ সালের পর থেকে সৈকতে হকারের সংখ্যা ও দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলেও তাঁদের দাবি।
বিচ কর্মীদের সুপারভাইজার মাহাবুব আলম বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের তিনটি পয়েন্টের বালিয়াড়ি হকারমুক্ত রাখতে প্রতিদিন মাইকিং করা হয়। একই সঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযানও পরিচালিত হয়। কিন্তু কোনোভাবেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। তাঁর দাবি, অনেক রোহিঙ্গা হকারও এখন সৈকতে ব্যবসা করছেন। সৈকতকে হকারমুক্ত রাখা বিচ কর্মীদের একার পক্ষে সম্ভব নয়।
সৈকতপাড়ের স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বলছেন, ২০২৪ সালের পর থেকে সৈকতে হকারের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। বালিয়াড়ির পাশাপাশি তিনটি পয়েন্টের সড়ক থেকে সৈকতে প্রবেশের পথগুলোও হকারদের দখলে চলে যাচ্ছে।
জেট স্কি ব্যবসায়ী সাদ্দাম বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে স্থানীয় হকারের সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০ জন। তাঁর দাবি, অন্যদের অনেকে রোহিঙ্গা এবং দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে সৈকতে ব্যবসা করছেন। এতে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সৈকতকে হকারমুক্ত করতে জেলা প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন এই ব্যবসায়ী।
অন্যদিকে, হকারদের দাবি, জীবিকা নির্বাহের তাগিদেই তাঁদের অনেকে সৈকতে পণ্য বিক্রি করেন। অপরাধ থেকে দূরে থেকে বৈধভাবে উপার্জনের সুযোগ চান তাঁরা। এ জন্য নির্দিষ্ট বিক্রয়স্থান নির্ধারণ, সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তিন কিলোমিটার এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে সাজানোর প্রস্তাব
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পুরো কক্সবাজারকে একসঙ্গে পরিকল্পিতভাবে সাজানো কঠিন হলেও সৈকতসংলগ্ন তিন কিলোমিটার এলাকাকে কেন্দ্র করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। এই এলাকায় যানবাহন চলাচল, হকার ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা, হাঁটাচলার পরিবেশ ও পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা উন্নত করা গেলে পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে পারে।
হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের মহাব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী বলেন, কক্সবাজারে আসা অধিকাংশ পর্যটকের চলাচল সৈকতসংলগ্ন তিন কিলোমিটার এলাকাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু টমটম চলাচলের অব্যবস্থাপনা, হকার ও ভিক্ষুকদের বারবার উপস্থিতি পর্যটকদের স্বাভাবিকভাবে অবসর কাটাতে বাধা দেয়।
ইয়াকুব আলীর মতে, পর্যটন মৌসুমে প্রশাসনের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। টমটম চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, হকারদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং সৈকতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে এসব সমস্যার কারণে পর্যটকেরা কক্সবাজার ভ্রমণে আগ্রহ হারাতে পারেন।
হোটেল কক্স টুডের মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব শাহ মনে করেন, সৈকতসংলগ্ন তিন কিলোমিটার এলাকাকে আধুনিক নকশায় সাজানো গেলে কক্সবাজারের পর্যটন আকর্ষণ বাড়বে। এ জন্য জেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নের পরামর্শ দেন তিনি।
আবু তালেব শাহ বলেন, ওই এলাকায় দৃষ্টিনন্দন হাঁটার পথ, সবুজ উদ্যান, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর উপযোগী সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সৈকতসংলগ্ন দোকানগুলোকে নির্দিষ্ট স্থান ও অভিন্ন নকশার আওতায় আনা গেলে পরিবেশের সৌন্দর্য বাড়বে, ব্যবসায়ীদের জন্যও সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা সহজ হবে।
তাঁর মতে, পর্যটকেরা শুধু সমুদ্র দেখতে কক্সবাজারে আসেন না। সন্ধ্যা ও রাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে হাঁটাচলা এবং অবসর কাটানোর মতো পরিবেশও তাঁদের প্রয়োজন। পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
সমন্বিত উদ্যোগের আশ্বাস প্রশাসনের
পর্যটনসেবার মান উন্নয়ন, হোটেল-মোটেলের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে পর্যটন ব্যবস্থাপনা উন্নত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সেবার মান উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে হোটেল-মোটেলসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তাসনীম জাহান বলেন, পর্যটকেরা যে অর্থ ও সময় ব্যয় করে কক্সবাজারে আসেন, সে অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যায়। তাঁদের ব্যয় ও সময়ের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করে ভ্রমণকে আনন্দদায়ক করাই প্রশাসনের লক্ষ্য। উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগলেও পর্যটন ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কক্সবাজারে একটি বিশেষ পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান এই কর্মকর্তা। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কক্সবাজারকে আরও আধুনিক ও পর্যটকবান্ধব গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনা ধরে রাখতে এখন বড় চ্যালেঞ্জ পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। হকার ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, যান চলাচল ও আবাসনসেবায় শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটকদের প্রত্যাশা, কক্সবাজারে এসে যেন সমুদ্র উপভোগের বদলে অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হতে না হয়।
