যেকোনো গুজব প্রতিরোধে ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হলো- কোনো সংবাদ শোনামাত্রই তা বিশ্বাস বা প্রচার না করে প্রথমে তার সত্যতা যাচাই করা। কেননা সাধারণত মানুষ কারো কাছ থেকে কোনো কথা শুনে সেটিকে সত্য ধরে নেয়।
কিন্তু একজন ভালো মানুষও ভুল তথ্য দিতে পারেন, আবার কোনো সংবাদ আংশিক সত্য হলেও তার উপস্থাপন বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তাই সংবাদদাতার পরিচয়ের পাশাপাশি সংবাদের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট যাচাই করাও জরুরি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো; যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।’ -সূরা হুজুরাত: ৬
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো চাঞ্চল্যকর সংবাদ দেখলে তার মূল উৎস খুঁজে দেখা, নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে তথ্যটি প্রকাশিত হয়েছে কি না যাচাই করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা উচিত। শুধু কোনো পোস্টে অনেক লাইক, শেয়ার কিংবা মন্তব্য রয়েছে বলেই সেটিকে সত্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
মানুষের মধ্যে গুজব ছড়ানোর অন্যতম কারণ হলো, শোনা কথা অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রবণতা। অনেকে মনে করেন, কোনো কথা নিজে তৈরি করে না বললে সেটি প্রচার করায় দোষ নেই। অথচ ইসলাম এ ধারণাকে সমর্থন করে না।
কারণ, মিথ্যা তথ্য অন্যের কাছ থেকে শোনা হলেও যাচাই ছাড়া তা প্রচার করার মাধ্যমে মানুষ মিথ্যা ছড়ানোর অংশীদার হয়ে যেতে পারে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে, তা-ই প্রচার করে।’ -সহিহ মুসলিম: ৫
গুজবের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ হলো, যখন তা কোনো ব্যক্তির চরিত্র, সম্মান কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অপবাদে পরিণত হয়। কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অসদাচরণ, অনৈতিকতা কিংবা অপরাধের অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া শুধু সামাজিক অন্যায় নয়; বরং এটি মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার গুরুতর অপরাধ। পবিত্র কোরআনে মিথ্যা অপবাদ ছড়ানোর ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যখন তোমরা মুখে মুখে তা ছড়াচ্ছিলে এবং এমন কথা মুখে বলছিলে, যে বিষয়ে তোমাদের কোনো জ্ঞান ছিল না; আর তোমরা একে তুচ্ছ মনে করছিলে, অথচ আল্লাহর কাছে তা ছিল অত্যন্ত গুরুতর।’ -সূরা নুর: ১৫
গুজব অনেক সময় শুরু হয় কুধারণা থেকে। কেউ কারও একটি আচরণ দেখে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেন। পরে সেই ধারণা অন্যের কাছে বর্ণনা করতে করতে তা অভিযোগে পরিণত হয়। এভাবে প্রমাণহীন ধারণা ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও শত্রুতার জন্ম দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো ধারণা পাপ। আর তোমরা গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না।’ -সূরা হুজুরাত: ১২
বর্তমান সময়ে গুজব প্রতিরোধের জন্য ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধও জরুরি। একটি মিথ্যা সংবাদ কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তা আমরা প্রায়ই দেখতে পাই। প্রথমে একজন ব্যক্তি কোনো ভিত্তিহীন তথ্য প্রকাশ করেন। এরপর অন্যরা যাচাই না করে সেটি শেয়ার করেন। ক্রমে একই তথ্য বহু জায়গায় ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ সেটিকে সত্য বলে ধরে নিতে শুরু করে। অথচ বারবার প্রচারিত হওয়া কোনো বক্তব্যই তার সত্যতার প্রমাণ নয়।
ইসলাম এমন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে মানুষ পরস্পরের প্রতি আস্থাশীল হবে, অন্যের সম্মান রক্ষা করবে এবং বিরোধের পরিবর্তে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে। গুজব সেই আস্থাকে ধ্বংস করে। কখনো তা পরিবারে সন্দেহ সৃষ্টি করে, কখনো প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে, আবার কখনো সামাজিক অস্থিরতা ও সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।’ -সূরা হুজুরাত: ১০
অতএব, কোনো সংবাদ শুনলে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো তথ্য দেখলে আবেগের বশে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে প্রথমে তার সত্যতা যাচাই করতে হবে। অন্যের সম্মানহানি হতে পারে- এমন তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আর ভুলবশত কোনো গুজব ছড়িয়ে ফেললে তা সংশোধন করার নৈতিক সাহসও রাখতে হবে।
