দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে সৌদি আরব?
চ্যানেল আই অনলাইনপ্রকাশ:
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাদের আটক, বিচার ও শাস্তি কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ। দেশটির কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাসকে আগে থেকে কিছু না জানানোর অভিযোগ ওঠায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক কনস্যুলার বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে কি না।
মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক’ কাজের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ওই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে সৌদি আরবের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে তাদের বিচারপ্রক্রিয়া, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো বাংলাদেশের হাতে নেই।
বিবিসি বাংলা এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঘটনার খবর জানার পর বৃহস্পতিবার জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, ওই দুই ব্যক্তির আটক, বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে আগে থেকে বাংলাদেশ মিশনকে কিছু জানানো হয়নি।
ভিয়েনা কনভেনশনে কী বলা আছে?
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ড. রায়হান রশীদের মতে, বিদেশে আটক কোনো নাগরিকের কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আটক ব্যক্তিকে তার দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রমাণ থাকার কথা।
তিনি আরও বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে দীর্ঘ বিচার ও আপিলপ্রক্রিয়া চলার কথা। তাই বাংলাদেশ দূতাবাসের বিষয়টি জানার সুযোগ থাকা উচিত ছিল। তবে আটক ব্যক্তি কনস্যুলার সহায়তা নিতে না চাইলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে।
ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরীফুল হাসান মনে করেন, দুই বাংলাদেশির আটক ও বিচার সম্পর্কে দূতাবাসকে না জানিয়ে সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। তার প্রশ্ন, অন্য কোনো দেশের নাগরিকের ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষ একই আচরণ করত কি না।
তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিদেশি নাগরিকের বিচার সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ। এ ক্ষেত্রে দূতাবাসকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা সব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য কি না, তা নির্ভর করে ঘটনার বিস্তারিত তথ্যের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাখ্যা চাইলে সৌদি আরব জবাব দিতে পারে, তবে জবাব দিতে আইনগতভাবে বাধ্য কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশে আটক ব্যক্তির কনস্যুলার যোগাযোগ ও সহায়তার অধিকার নিয়ে বিধান রয়েছে। তবে এ বিধানের প্রয়োগ, আটক ব্যক্তিকে কীভাবে তার অধিকার জানানো হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা যাচাই না করে এ ঘটনায় চূড়ান্তভাবে কনভেনশন লঙ্ঘনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
মরদেহ দেশে ফেরানো নিয়ে অনিশ্চয়তা
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাদের মরদেহ কোথায় রয়েছে এবং বাংলাদেশে পাঠানো হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাতে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো বাংলাদেশকে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।
ফলে মরদেহ কবে নাগাদ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সাধারণত পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে দূতাবাস মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। কিন্তু এ ঘটনায় পরিবার ও বাংলাদেশ মিশনের সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের যোগাযোগের বিষয়টিই এখনো পরিষ্কার নয়।
এ ছাড়া ওই দুই বাংলাদেশির পরিচয়, বিচারপ্রক্রিয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য না পাওয়ায় তাদের আইনি অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নও রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের চাওয়া ব্যাখ্যায় সৌদি কর্তৃপক্ষ কী জানায়, তার ওপরই এখন পরিস্থিতির আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া নির্ভর করছে।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
