মুক্তধারা
উৎসব ১৪৩৩
গল্প
আত্মত্যাগ : সৌরীশ মিশ্র
২৫ অক্টোবর ২০২৬ - ৪র্থ বর্ষ
বোঝার ক্ষমতা হয়েছে যবে থেকে তবে থেকেই দেখে আসছি, বাড়িতে দুটো পুজোসংখ্যা রাখা হচ্ছে। একটা বাবা-মার জন্য, যেটা তথাকথিত বড়দের পত্রিকা। আর একটা আমার জন্য, যেটা তথাকথিত ছোটদের। তা, যে বছরের পুজোর কথা লিখছি, তখন আমার বারো কি তেরো বছর বয়স। বন্ধুদের কাছে স্কুলে একদিন শুনলাম নতুন একটি প্রকাশনী ছোটদের জন্য একটা পুজোসংখ্যা বের করছে এইবার, সেইটা নাকি দারুণ হবে। সবাই নাকি বলছে সে কথা। ছোটবেলা থেকে গল্পের বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসতাম। তাই, তখনই মনে-মনে ঠিক করে ফেললাম, আমাকেও কিনতে হবে ঐ পুজোসংখ্যাটাও। বাড়ি ফিরেই সেইদিন বললাম মা-কে। মা বললেন, বাবাকে বলবে। রাতে খাওয়ার সময়, মা কথাটা বললেন বাবাকে। বাবা বললেন, "ঠিক আছে, কাল অমিতকে বলে দেবো।" অমিতকাকুই আমাদের বাড়িতে তখন খবরের কাগজ দিত।
যাই হোক, এরপর কেটে গেছে কয়েকদিন। এক রবিবার হঠাৎ সকালবেলায় অমিতকাকু হাজির হয়ে গেল আমার দুটো পুজোসংখ্যা নিয়েই। বাবা আমার হাতে তুলে দিলেন সেগুলো। কি যে আনন্দ হচ্ছিল আমার! বাবার মুখেও দেখলাম হাসি। আমি তাড়াতাড়ি বইদুটো নিয়ে আমার পড়ার ঘরে চলে এলাম সোজা। তারপর পাতা উল্টে-উল্টে দেখতে থাকলাম দুটো বই-ই। পাতা উল্টাচ্ছি আর ভাবছি, এইবারের পুজোটা দারুণ আনন্দে কাটবে। দু'-দু'টো পূজাবার্ষিকী পড়বো পুজো জুড়ে। আনন্দ হবে না! বইদুটো উল্টে-পাল্টে দেখা শেষ হতে, মনে হোলো বাবা-মা-কেও দেখাই গিয়ে। বাবা-মায়ের গলা পাচ্ছিলাম বসার ঘর থেকে। পড়ার ঘর থেকে ছুটে বেড়িয়ে বসার ঘরে ঢুকতে যাবো, তখনই কানে এল বাবা-মায়ের মধ্যের কথোপকথন।
বাবা বলছেন, "অমিতকে আমাদের পুজোসংখ্যাটা দিতে বারণ করে দিলাম।"
মা বললেন, "ভালোই করেছো।"
বাবা আবার বললেন, "ও জিজ্ঞেস করছিল, কেন নেবো না। বলল, এই পুজোসংখ্যাটা তো আপনি সববছরই নেন। তবে! ওকে তখন খুলেই বললাম, তিনটে পুজোসংখ্যা নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ও বলছিল, পরের মাসে টাকা দিতে। আমি রাজী হলাম না। সবসময় পুজোসংখ্যার টাকা সাথে-সাথেই দিয়ে দিই ওকে। এইবার একটার দাম আবার পরে দেবো, সেটা ভালো দেখায় না। কি বলো?"
মা বলেন, "ঠিক।"
বাবা ফের বলতে থাকেন, "তাছাড়া, এই পুজোর মাসগুলোয় হবে না, কিন্তু তারপর যদি ঐ পুজোসংখ্যাটা মার্কেটে তখনও পাওয়া যায় তখন কিনে নিলেই হবে।"
বাবা-মায়ের মধ্যের এই কথোপকথন শোনার পর সেইদিন ঐ বসার ঘরে ঢুকতে পারিনি আর। আমি তখন ছোটো, তা হলেও বাবা-মায়ের ঐ কথাবার্তা থেকে বুঝতে অসুবিধা হয়নি একটুও, আমাকে আর একটা পুজোসংখ্যা কিনে দেওয়ার জন্য, বাবা-মায়ের পছন্দের পুজোসংখ্যাটা কেনা হোলো না।
আমার দু'চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল তখন আমার হাতে ধরা দুটো পুজোসংখ্যার উপরেরটার মলাটের উপর টপটপ করে।
