থাইরয়েড ক্যানসার এমন এক ধরনের ক্যানসার, যা গলার সামনের দিকে অবস্থিত প্রজাপতির মতো আকৃতির থাইরয়েড গ্রন্থির কোষে শুরু হয়। এই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, শরীরের তাপমাত্রা ও ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রোগটির প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে ক্যানসার বড় হতে থাকলে গলায় ফোলা বা চাকা, কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন এবং খাবার গিলতে অসুবিধার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
থাইরয়েড ক্যানসারের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্যানসার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং চিকিৎসায় ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে কিছু ধরন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে ওঠে।
যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
থাইরয়েড ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত স্পষ্ট কোনো উপসর্গ থাকে না। রোগটি বাড়তে থাকলে কয়েকটি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন:
- গলার ত্বকের নিচে চাকা বা গিঁট অনুভব করা।
- জামার কলার আগের তুলনায় বেশি আঁটসাঁট মনে হওয়া।
- কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হওয়া বা ক্রমাগত ভাঙা ভাঙা শোনানো।
- খাবার বা পানি গিলতে অসুবিধা হওয়া।
- গলার লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া।
- গলা বা ঘাড়ে ব্যথা অনুভব করা।
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলেই থাইরয়েড ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। অন্যান্য রোগের কারণেও এসব উপসর্গ হতে পারে। তবে কোনো লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা গলায় নতুন কোনো চাকা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কেন হয় থাইরয়েড ক্যানসার
থাইরয়েড গ্রন্থির কোষের ডিএনএতে পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটলে ক্যানসার সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং স্বাভাবিক নিয়মে মারা যাওয়ার পরিবর্তে বেঁচে থাকে। এভাবে অস্বাভাবিক কোষ জমে টিউমার তৈরি করে। টিউমার আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কখনো গলার লসিকাগ্রন্থি ছাড়িয়ে ফুসফুস, হাড় ও শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়ে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডিএনএতে এই পরিবর্তন কেন ঘটে, তা স্পষ্ট নয়।
থাইরয়েড ক্যানসারের ধরন
থাইরয়েড ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ ধরন হলো প্যাপিলারি থাইরয়েড ক্যানসার। এটি যেকোনো বয়সে হতে পারে, তবে ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। সাধারণত এটি ধীরে বাড়ে এবং চিকিৎসায় ভালো সাড়া দেয়।
ফলিকুলার থাইরয়েড ক্যানসার তুলনামূলক বিরল এবং সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সিদের মধ্যে দেখা যায়। এর কিছু ধরন ফুসফুস ও হাড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এ ছাড়া হার্থল সেল, অপর্যাপ্তভাবে বিভেদিত, অ্যানাপ্লাস্টিক ও মেডুলারি থাইরয়েড ক্যানসার রয়েছে। অ্যানাপ্লাস্টিক ক্যানসার দ্রুত বাড়তে পারে এবং শ্বাস নেওয়া ও খাবার গিলতে গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে। মেডুলারি থাইরয়েড ক্যানসার থাইরয়েডের সি-কোষে শুরু হয়। এর কিছু ধরন বংশগত জিনগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
থাইরয়েড ক্যানসার পুরুষদের তুলনায় নারীদের বেশি হয়। এ ছাড়া মাথা ও ঘাড়ে উচ্চমাত্রার বিকিরণ চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পারিবারিক মেডুলারি থাইরয়েড ক্যানসার, মাল্টিপল এন্ডোক্রাইন নিওপ্লাসিয়া, কাউডেন সিনড্রোম ও ফ্যামিলিয়াল অ্যাডেনোমেটাস পলিপোসিসের মতো বংশগত রোগও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে থাইরয়েড ক্যানসার শনাক্তের হার বাড়ছে। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি। অন্য রোগের জন্য সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করার সময় ছোট থাইরয়েড ক্যানসারও ধরা পড়ছে। এ ধরনের ছোট ক্যানসার সাধারণত চিকিৎসায় ভালো সাড়া দেয়।
তাই গলায় অস্বাভাবিক চাকা, দীর্ঘস্থায়ী কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন কিংবা খাবার গিলতে সমস্যা হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দ্রুত মূল্যায়নের মাধ্যমে রোগ শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিকল্পনা করা সম্ভব।
সূত্র: মায়ো ক্লিনিক