কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি নতুন ধরনের জৈব অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি ও এর ভয়াবহতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইফাইভ-এর প্রধান।
সম্প্রতি বার্ষিক এক ভাষণে এমন আশঙ্কার কথা বলেছেন এমআইফাইভ-এর প্রধান স্যার কেন ম্যাককালাম।
তার বক্তব্যের পর এআই প্রযুক্তি কীভাবে জৈব অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করতে পারে ও এর পেছনে কী কী বাধা রয়েছে তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
এআই কীভাবে জৈব অস্ত্র তৈরিতে সাহায্য করতে পারে?
বিষয়টি নির্ভর করে কারা এই অস্ত্র তৈরি করতে চায় তার ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই ধরনের গোষ্ঠী এআই প্রযুক্তি অপব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে। প্রথমত, কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই একক বা ছোট কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, যারা গ্যারেজে বা ছোট পরীক্ষাগারে বসে ক্ষতিকর প্যাথোজেন ও বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করার চেষ্টা চালাতে পারে।
এআই চ্যাটবট তাদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সাজানো, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিকল্পনা ও কারিগরি জটিলতা সমাধানের সহায়িকা হিসেবে কাজ করার ঝুঁকি তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, বিপুল অর্থায়ন ও প্রযুক্তিওয়ালা সংস্থা বা শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহ। এদের রয়েছে দক্ষ বিজ্ঞানী, উচ্চ সুরক্ষাওয়ালা ল্যাব এবং প্রয়োজনীয় সব রাসায়নিক ও আধুনিক সরঞ্জাম।
‘কিংস কলেজ লন্ডন’-এর বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ের শিক্ষক ডা. ফিলিপা লেনটজস বলেছেন, এটাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
তার ভাষ্য, এআই প্রযুক্তি এখানে নতুন বিজ্ঞানের অভিজ্ঞতা তৈরি না করলেও দক্ষ বিজ্ঞানীদের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে ও ক্ষতিকর উপাদানকে আরও বেশি প্রাণঘাতী করার উপায় বের করতে সহায়তা করছে।
অন্যান্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, উচ্চ সক্ষমতাওয়ালা দলগুলো এআই ব্যবহার করে এমন সম্পূর্ণ নতুন প্যাথোজেন বা বিষাক্ত উপাদান নকশা করতে পারে, যার কোনো ওষুধ বা প্রতিষেধক বাজারে নেই। বাস্তব ক্ষেত্রেও এ ধরনের চেষ্টার নজির মিলতে শুরু করেছে।
জৈব অস্ত্র তৈরিতে কি এআই ব্যবহারের চেষ্টা হয়েছে?
গেল বছর ভারতে একজন চিকিৎসক ও আরও কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এআই চ্যাটবট ও সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে ঘরের সরঞ্জাম দিয়ে মারাত্মক ‘রাইসিন’ বিষ তৈরির ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পায় দেশটির পুলিশ।
এ ছাড়া, গত বছরের সেপ্টেম্বরে এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিক বলেছে, নাম না প্রকাশ করা কিছু দেশের বিজ্ঞানীরা তাদের চ্যাটবট ক্লড ব্যবহার করে ক্ষতিকর ভাইরাস বা বিষাক্ত উপাদান নিয়ে কাজ করার চেষ্টা চালিয়েছে। চ্যাটবটের সুরক্ষা দেয়াল অতিক্রম করতে তারা ভিন্ন কৌশলও অবলম্বন করেছে।
এক ঘটনায় বিজ্ঞানীরা বার্ড ফ্লু ভাইরাসকে রূপান্তরিত করে তা যেন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে সহজে ছড়াতে পারে সেই সংক্রান্ত গবেষণার পরিকল্পনা তৈরি করতে চ্যাটবটের সহায়তা চেয়েছিল।
এ ধরনের কাজ একদিকে যেমন প্রাণঘাতী জীবাণু তৈরির উদ্দেশ্যে হতে পারে, অন্যদিকে মহামারীর আগে থেকে প্রতিরোধমূলক ওষুধ বা টিকা তৈরির জন্য বৈধ ল্যাবেও করা হয়।
আর কী কী বিষয় উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে?
এআই প্রযুক্তি কীভাবে বিপজ্জনক তথ্য সরবরাহ করে জৈব অস্ত্রের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শঙ্কা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
‘ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ বা এমআইটি’র এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো ধরনের বৈজ্ঞানিক অভিজ্ঞতা না থাকা শিক্ষার্থীরাও এআই চ্যাটবটের সহায়তায় কেবল এক ঘণ্টার মধ্যে চারটি সম্ভাব্য মহামারি তৈরিকারী প্যাথোজেন চিহ্নিত করতে পেরেছে।
কৃত্রিম ডিএনএ ব্যবহার করে তা তৈরি ও কোন কোন সরবরাহ কোম্পানি কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই সরঞ্জাম পাঠাবে তার তালিকাও পেয়েছে তারা।
একইভাবে ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনভার্সিটি’র গবেষক ড. ডেভিড রেলম্যান বলেছেন, প্রতিষেধক বা চিকিৎসা প্রতিরোধী প্যাথোজেন রূপান্তরের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করছে একটি এআই।
অন্যদিকে, হাইড্রোজেন বা হিলিয়াম গ্যাসপূর্ণ বেলুন ব্যবহার করে আকাশ থেকে কীভাবে জৈব অস্ত্র ছড়ানো যায় এমন নির্দেশনাও দিয়েছে চ্যাটবট।
এ ছাড়া প্রযুক্তিটির দ্বিমুখী ব্যবহারের কারণে জনস্বাস্থ্য রক্ষার কাজ ও ক্ষতিকর জৈব অস্ত্র তৈরির চেষ্টার মধ্যকার পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘লস অ্যালামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি’র গবেষকরা সামুদ্রিক শামুকের বিষ কীভাবে মানবকোষে প্রভাব ফেলে তা বোঝার জন্য এআই রূপান্তর করেন, যা প্রতিষেধক তৈরিতে সহায়ক।
তবে চীনের গবেষকরা যখন সেই গবেষণা ব্যবহার করে নতুন বিষাক্ত উপাদান তৈরির সরঞ্জাম তৈরি করেন তখন মার্কিন প্রশাসন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। চীনের দাবি, তাদের উদ্দেশ্যে ছিল নিছকই ওষুধ তৈরি।
এ বছরের এপ্রিলে বিজ্ঞানীরা এআই দিয়ে তৈরি প্রথম কৃত্রিম ভাইরাস উন্মোচন করলে বৈশ্বিক বায়ো-সিকিউরিটি নিয়ে ফের জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাস্তবে জৈব অস্ত্র তৈরি কতটা কঠিন?
এআই তথ্য দিলেও অনভিজ্ঞদের পক্ষে বাস্তবে জৈব অস্ত্র তৈরি করা জটিল ও বিপজ্জনক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল লিখিত নির্দেশনাই কোনো কিছু তৈরির জন্য যথেষ্ট নয়।
‘কিংস কলেজ লন্ডন’-এর শিক্ষক ফিলিপা লেনটজস বলেছেন, “সমস্যার কেবল একটি অংশ হচ্ছে তথ্য। বাস্তবভিত্তিক সূক্ষ্ম জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা, প্রয়োজনীয় জৈব উপাদান ও সরঞ্জামের সুযোগ, পরীক্ষাগারে তার সঠিক প্রয়োগ এবং তা বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা এগুলো এখনও বড় প্রতিবন্ধকতা।”
ভার্জিনিয়ার ‘জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটি’র বায়োডিপেন্স প্রোগ্রামের উপ-পরিচালক সোনিয়া বেন ওয়াগ্রাম-গোরমলি বলছেন, বই বা এআই দিয়ে যা শেখা যায় না সেই বাস্তব ‘অলিখিত জ্ঞানই’ ঐতিহাসিক জৈব অস্ত্র প্রকল্পগুলোর মূল চাবিকাঠি ছিল।
অন্যদিকে ‘ইউনিভার্সিটি অফ জুরিখ’-এর অধ্যাপক মার্টিন পাচেসা বলেছেন, “পদার্থবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী পারমাণবিক বোমার নকশা করে ফেলতে পারে, কিন্তু সে ইউরেনিয়াম পাবে কোথায়? একই কথা জৈব অস্ত্রের ক্ষেত্রেও সত্য। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও নিরাপদ ল্যাবের সুবিধা না থাকলে কেবল এআই দিয়ে বড় কোনো ক্ষতি করা সম্ভব নয়।”
অতিরিক্ত কী কী নিরাপত্তা প্রয়োজন?
‘জনস হপকিন্স সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটি’র পরিচালক অধ্যাপক টম ইঙ্গলসবি বলেছেন, কিছু এআই কোম্পানি জৈব অস্ত্র প্রতিরোধে নিজস্ব পদক্ষেপ নিলেও বেশিরভাগই কোনো স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করছে না। এ ধরনের অপব্যবহার ঠেকাতে কোনো দেশেই এখনও আনুষ্ঠানিক সরকারি নীতি কার্যকর হয়নি।
যে কোনো নতুন এআই মডেল সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার আগে সেগুলোর আনুষ্ঠানিক ও স্বাধীন মূল্যায়ন হতে হবে। সেইসঙ্গে সংক্রামক ব্যাধি ছড়ানোর মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জৈব তথ্যগুলোর ব্যবহার সীমিত করতে হবে।
পাশাপাশি যেসব কোম্পানি কৃত্রিম ডিএনএ তৈরি করে তাদের প্রতিটি অর্ডারের গ্রাহক যাচাই-বাছাই বাধ্যতামূলক করার জোর দাবি উঠেছে, যাতে ক্ষতিকর বা নতুন এআই-নকশাকৃত জেনেটিক সিকোয়েন্স কেউ আড়ালে তৈরি করতে না পারে।
