চাঁদাবাজি বন্ধে বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা দূর করতে আইন সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের চিন্তা করছে সরকার। এতে চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তি কোনো কারণে মামলা করতে না চাইলেও পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করতে পারবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে, গত ১৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে ওই কার্যবিবরণী অনুমোদন দেওয়া হয়।
কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ চাঁদাবাজি বন্ধে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পেনাল কোডের বিদ্যমান আইনি দুর্বলতা দূর করতে আইন সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের চিন্তা করা হচ্ছে। এতে ভুক্তভোগী ব্যক্তি ভয়ে পিছিয়ে গেলে বা মামলা করতে না চাইলেও পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করতে পারে।
মন্ত্রী আরও বলেন, চাঁদা আদায়কারী এবং তাদের পেছনের গডফাদারদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে অডিও ও ভিডিও রেকর্ড আদালতের গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। একই সঙ্গে মোবাইল কোর্টের সামান্য শাস্তির বদলে কঠোর সাজা নিশ্চিত করার আইনি সংস্কারের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধবিদ্যা বিশেষজ্ঞ মো. রেজাউল করিম সোহাগ আজকের পত্রিকাকে বলেন, নতুন আইনের প্রয়োজন নেই; বিদ্যমান আইনে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া সম্ভব। তারপরও আইনে কোথাও দুর্বলতা বা ফাঁকফোকর থাকলে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন আইন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে আন্তরিকতা দেখাতে হবে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সাইবার অপরাধ দমনে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) আইনি এখতিয়ার বৃদ্ধি করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
তবে এই বিশেষজ্ঞের মতে, অপরাধের শিকার ব্যক্তিকেই মামলা করতে এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশকে বাদী করে মামলা করার বিধান চালু হলে, তা হিতে বিপরীত হতে পারে এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। জনবান্ধব পুলিশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা বাস্তবায়নে এমন বিধান অন্তরায় হতে পারে। তাই ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের মামলা করার সুযোগের পাশাপাশি তাঁদের ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পুলিশকে বাদী করে মামলা করার ব্যবস্থা ইতিবাচক বার্তা দেবে না বলে তিনি মনে করেন।
সংসদীয় কমিটির সভার কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, মেডিকেল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে রাত জেগে পড়াশোনার প্রলোভনে ইয়াবায় অভ্যস্ত করা হচ্ছে বলে সভায় জানান পুলিশের আইজিপি আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেন, ‘বেকারত্বের কারণে যুবসমাজ মাদকে আসক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে রাত জেগে পড়ার প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের ইয়াবায় অভ্যস্ত করা হচ্ছে।’ এ সময় আইজিপি মাদক প্রতিরোধে কার্যকর পলিসি গ্রহণ ও মোটিভেশনাল কর্মসূচি চালুর ওপর জোর দেন।
ওই সভায় কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, সমাজে মাদকের সমস্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মাদক-সংক্রান্ত মামলা নিয়ন্ত্রণ বা দমন অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদক উদ্ধারের জব্দ তালিকা ও মামলার এজাহার নিয়ে প্রশ্ন তুলে সভাপতি বলেন, মামলার নথিপত্র দুর্বলতার জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আসামিরা পার পেয়ে যায়।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা বিতর্কিত বা নেতিবাচক ভূমিকায় ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল সংসদীয় কমিটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মন্ত্রণালয় বিভাগীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে জানায়। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার ১৪৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া একই ঘটনায় ৭৩ জন পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে অবসর দেওয়া হয়েছে।
সভায় জানানো হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে পলায়নের অভিযোগে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ৬২ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। এর মধ্যে ৩১ জনের বিরুদ্ধে মামলা নিষ্পত্তি করে চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি ৩১ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে আইসিটির মামলার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব ১৩ জন কর্মকর্তার মধ্যে ৫ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বাকি ৮ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে। ৫ আগস্টকেন্দ্রিক ঘটনায় কর্মস্থলে অনুপস্থিত/পলাতক এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব ৫৭ জন কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে।
গণ-অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ফৌজদারি/সিআর/আইসিটি মামলায় গ্রেপ্তার ২৯ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দুজন ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এবং চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়ের তুলনামূলক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র বা মামলা-সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরা হয়। তাতে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে দেশে মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত মামলা ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা বেড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত মামলা বেড়েছে ১৪ হাজার ৩২২টি। একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ১ হাজার ২৭১টি। অন্যদিকে কমেছে খুন, ডাকাতি, দস্যুতা ও নারী নির্যাতনের মামলা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা ছিল ৫ হাজার ৩৮১টি। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ১১০টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ১ হাজার ২৭১টি।
সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে সারা দেশে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধ এবং দমনে নেওয়া কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও সাইবার অপরাধ দমনে পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনসহ সরকারের নেওয়া প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা হয়। অপরাধ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যুগোপযোগী প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়।
কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও অংশগ্রহণ করেন কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, কমিটির সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, মনোয়ার হোসেন, শিরীন সুলতানা, নূরুল ইসলাম ও আব্দুল বাতেন।
