দেশে ক্রমবর্ধমান সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার ল্যাব স্থাপন, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি সাইবার অপরাধের মামলা তদন্তে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
সাইবার অপরাধের বিস্তারে বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি, পারিবারিক কলহ, মানসিক বিপর্যয় ও সামাজিক মর্যাদাহানির ঘটনা। অনলাইন প্রতারণা, হয়রানি, হুমকি এবং ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে অপরাধীরা সাধারণ মানুষকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ভুয়া পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো এবং ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, সাইবার জালিয়াতি, হ্যাকিং ও অনলাইন হয়রানি-সংক্রান্ত মামলাগুলো পেশাদারত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সাইবার অপরাধ দমনে নিয়মিত নজরদারি ও টহল কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, সাইবার অপরাধ তদন্তে কর্মরত কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে সাইবার ট্রেনিং সেন্টার, ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (এফটিআই) ও ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে (ডিটিএস) চলমান প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে নতুন নতুন মডিউল যুক্ত করা হচ্ছে। পুলিশ সদরদপ্তরের উদ্যোগে দেশব্যাপী ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্সও চালু হয়েছে, যেখানে সিআইডির কর্মকর্তারা অংশ নিচ্ছেন।
সিআইডির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধ-সংক্রান্ত জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) ৩২টি এবং সিআর (ক্রিমিনাল রেজিস্টার) ১৫৯টিসহ মোট ১৯১টি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া এক বছরে সাইবার অপরাধের অভিযোগে ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপে ঘরে বসে খণ্ডকালীন কাজ, ইউটিউবের ভিডিওতে ‘লাইক’ দিয়ে আয় কিংবা সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করা হচ্ছে। সাধারণ গৃহিণী, শিক্ষার্থী ও বেকার তরুণদের লক্ষ্য করে প্রথমে এক থেকে দুই হাজার টাকা বোনাস দিয়ে আস্থা অর্জন করে প্রতারকরা। পরে বিভিন্ন ‘টাস্ক’ পূরণের নামে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
একটি সমীক্ষার বরাতে বলা হয়েছে, গত এক বছরে এ ধরনের আর্থিক প্রতারণায় সাধারণ গ্রাহকরা শত শত কোটি টাকা হারিয়েছেন। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। অপরাধ দমন এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার বুলিং ও অনলাইন প্রতারণার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। মিথ্যা সংবাদ ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সমাজে আতঙ্ক, বিভ্রান্তি ও বিরোধ তৈরি করা হচ্ছে। দুর্বল পাসওয়ার্ড, অপরিচিত লিংকে প্রবেশ, ভুয়া ওয়েবসাইট ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের কারণে সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সাইবার অপরাধও দ্রুত বাড়ছে। এসব অপরাধে সমাজের সাধারণ ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ওটিপি শেয়ারিং, ভুয়া ফোনকল, ডিপফেক ভিডিওর মাধ্যমে প্রতারণা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে অনেকে সারা জীবনের সঞ্চয় হারাচ্ছেন। এর ফলে অনেকে মানসিক সংকটেও পড়ছেন। তিনি আরও বলেন, সাইবার অপরাধের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতি মোকাবিলায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশ দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখায় একটি সাইবার ল্যাব রয়েছে। এ ছাড়া কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমে (সিটিটিসি) একটি ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল অপরাধের মামলা তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হবে।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন বিভাগে সাইবার অপরাধ-সংক্রান্ত মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। রমনা বিভাগে ৮৮টি মামলায় ১৬৩ জন, লালবাগ বিভাগে ২২টি মামলায় ২৩ জন, ওয়ারী বিভাগে ১২টি মামলায় ২৪ জন, মতিঝিল বিভাগে ৩৩টি মামলায় ৪৯ জন, তেজগাঁও বিভাগে ৫৩টি মামলায় ৪৯ জন, মিরপুর বিভাগে ৩৩টি মামলায় ২৭ জন, গুলশান বিভাগে ৩৮টি মামলায় ৩৭ জন এবং উত্তরা বিভাগে ২৬টি মামলায় ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে চলতি মাসে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব উদ্বোধন করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১ অক্টোবর ঢাকায় স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠন করা হয়েছে। ইউনিটটিতে ৪ হাজার ৫৯২ জন পুলিশ সদস্য ও অন্যান্য কর্মী রয়েছেন। একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নেতৃত্বে কেন্দ্রীয়ভাবে ইউনিটটি পরিচালিত হচ্ছে। বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায়েও সাইবার অপরাধ তদন্তের জন্য পৃথক কার্যক্রম বা ডেস্ক রয়েছে।
সম্প্রতি মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজে সাইবার অপরাধের মামলা তদন্তের ওপর ১০ দিনব্যাপী বিশেষ টিওটি কোর্স পরিচালনা করা হয়। এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ৩৩২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতা জরুরি। অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা, অচেনা ব্যক্তিকে পিন বা ওটিপি দেওয়া এবং যাচাই না করে কোনো ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য প্রবেশ করানো থেকে বিরত থাকতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
তাদের মতে, দক্ষ তদন্তকারী দল, আধুনিক ডিজিটাল ফরেনসিক সুবিধা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম সমন্বিতভাবে জোরদার করা গেলে সাইবার অপরাধ মোকাবিলা আরও কার্যকর হবে।
The post সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় সরকারের ‘বড় উদ্যোগ’ appeared first on ভোরের চেতনা.
