সরজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বহদ্দারহাট থেকে নগরীর কালুরঘাট পর্যন্ত সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে খানাখন্দে ভরপুর। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির উচ্চমাত্রার বৈদ্যুতিক কেবল সড়কের নিচে স্থাপনের কাজ প্রায় ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলায় সড়কটি নিত্য তীব্র যানজটের মধ্যে রয়েছে।
বন্দর নগরী চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সিটি করপোরেশন। বাণিজ্যিক এ শহরের একাধিক সংস্থা নগর ব্যবস্থাপনায় থাকলেও নাগরিক সেবা-সুবিধার সিংহভাগই অভিজাত এলাকাকেন্দ্রিক। ফলে কয়েকটি সড়ক, জোন ও এলাকা ব্যতীত প্রায় দেড়শ বর্গকিলোমিটারের সিটি করপোরেশনটির অধিকাংশ এলাকাই অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে, যা প্রায় ৭০-৮০ লাখ জনসংখ্যার নগরীকে নাজুক ও বাস অযোগ্যতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেশগত দিক দিয়ে কয়েক দশকে বিপন্নতার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে চট্টগ্রামকে। শতাধিক খালের মধ্যে অনেক খালই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিদ্যমান খালগুলোও দখল-দূষণে সরু হয়ে গেছে। নগরীর অধিকাংশ পাহাড়ই কেটে ফেলা হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমানতালে যানবাহনের সংখ্যা ও তীব্র যানজট বেড়েছে। যানজট এড়াতে নেয়া অপরিকল্পিত সড়ক ও ফ্লাইওভার নির্মাণের ফলে বিশৃঙ্খল নগরীতে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। প্রয়োজনীয় ও পরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বিদ্যমান সুবিধাও ব্যাহত হচ্ছে। এতে বন্দর, শিল্প ও বাণিজ্য নগরীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাচ্ছে না স্থানীয় নাগরিক ও দেশের অর্থনীতি।
সরজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বহদ্দারহাট থেকে নগরীর কালুরঘাট পর্যন্ত সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে খানাখন্দে ভরপুর। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির উচ্চমাত্রার বৈদ্যুতিক কেবল সড়কের নিচে স্থাপনের কাজ প্রায় ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলায় সড়কটি নিত্য তীব্র যানজটের মধ্যে রয়েছে। কেবল বসানোর পরও সড়কের কেটে ফেলা অংশের ওপরে পিচ না বসানোয় ওই অংশে যানবাহন চলাচল করা অসম্ভব। বর্ষার কারণে কাঁদা ও গর্ত তৈরি হওয়ায় অনেক স্থানেই যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকা, কালুরঘাট বিসিক শিল্প নগরী, মোহরা ভারী শিল্প এলাকায় ভারী যানবাহন চলাচল করলেও আরাকান সড়কের উভয় পাশে দখল, বালিসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা, সারিবদ্ধ ট্রাক ও বাস পার্কিং গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটি মানুষের ভোগান্তির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের ড্রেনেজ কাজ, ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্প, এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প নির্মাণের ফলে খোঁড়াখুঁড়িতে বসবাসের অনুপযোগী এলাকায় পরিণত হয়েছে। লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ হলেও নিচের সড়কটির অব্যবস্থাপনায় নিয়মিত তীব্র যানজট ও চলাচলে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়। তাছাড়া প্রকল্পের কাজ ও উদাসীনতায় অধিকাংশ ফুটপাত না থাকা, বেদখল হয়ে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যাওয়ায় মানুষের নিত্য চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
জানা গেছে, দেড় দশক ধরে চলমান জলাবদ্ধতা সংকট এড়াতে সিডিএ উদ্যোগে জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্প নেয়া হয় ২০১৭ সালে। দীর্ঘ এ সময়েও প্রকল্পটির শতভাগ কাজ শেষ হয়নি। আবার ৯৫ শতাংশের বেশি কাজ হলেও সাম্প্রতিক বর্ষা মৌসুমেও জলাবদ্ধতার ভোগান্তিতে পড়েছে নগরবাসী। অভ্যন্তরীণ সাড়ে তিন হাজার ছোট-বড়-মাঝারি সড়কের অধিকাংশই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেরামত না হওয়া, নিম্নমান ও অপরিকল্পিত মেরামতকাজের ফলে দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হচ্ছে বাসিন্দাদের।
বিগত দেড় দশক ধরে চট্টগ্রামের গ্রিন ও ক্লিন ওয়ার্ড হিসেবে ২১ নং জামাল খানকে ব্র্যান্ডিং করেছে সিটি করপোরেশন। সবুজায়ন, সৌন্দর্যবর্ধন, বর্জ্য থেকে শুরু করে সড়ক ও ড্রেনেজ অবকাঠামোর পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে জামাল খান ওয়ার্ড স্বীকৃতি পেলেও নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে বাকিগুলোর অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। এছাড়া নগরীর নাসিরাবাদ, খুলশী, জিইসি মোড়, ও আর নিজাম রোড, কাতালগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি অভিজাত এলাকার প্রতি নগর প্রশাসনের বিশেষ তদারকি থাকলেও প্রশাসনিকভাবে দূরের শ্রম ও জনসংখ্যাঘন এলাকার অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। বিগত কয়েক বছরেও এর আশানুরূপ পরিবর্তন হয়নি।
তথ্যমতে, অতীতে চসিক এলাকায় ১১৮টি খালের অস্বিত্ব ছিল। অনেকগুলো বিলীন হয়ে গেলেও প্রকল্পের অধীনে ৩৬টি খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়নের কাজ করছে সিডিএ। এছাড়া আরো ৫৭টি খাল একইভাবে উন্নয়নের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। আগে চসিক এলাকায় ২০০টিরও বেশি পাহাড় ছিল, বর্তমানে কমে ৭০টিতে নেমে এসেছে।
চসিকের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর বর্তমান আয়তন ১৫৫ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার। ৪১টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ নগরীতে আনুমানিক জনসংখ্যা ৬০ লাখ দেখানো হলেও প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি। এর বাইরে ভাসমান জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ১৫ লাখ।
নগরীতে মোট সড়ক রয়েছে ৩ হাজার ৪৫৯টি, যার দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪৪২ দশমিক ৫ কিলোমিটার। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভাঙা পিচ ঢালাই, খানাখন্দ ও অসমতল সড়কপৃষ্ঠ যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানতে চাইলে চসিকের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা ঠিক যে চট্টগ্রাম নগরী দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিতভাবে অপারেট হয়েছে। বর্তমানে নতুনভাবে চট্টগ্রামকে ঢেলে সাজানোর নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রকল্প শেষ না হলেও এবারের রেকর্ড বৃষ্টিপাতেও জলাবদ্ধতার পরিমাণ ছিল খুবই নগণ্য। পতেঙ্গায় দেশের প্রথম সাইকেল লেন নির্মাণ, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচে সবুজায়ন বেশকিছু টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।’
চট্টগ্রাম নগরীর এসব অব্যবস্থাপনার বিষয়টি স্বীকার করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগরীর অবকাঠামো নির্মাণসহ নানান কাজে অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের ছাপ রয়েছে। বর্তমানে সিডিএ নগরীর নানান অব্যবস্থাপনাকে দূর করে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে সিডিএ কাজ শুরু করেছে। অনুমোদনহীন ভবন নির্মাণ প্রতিহত করা, ভবন নির্মাণ নীতিমালা পুরোপুরি মেনে চলাসহ চট্টগ্রাম শহরকে সম্প্রসারণ করে একটি পরিকল্পিত নগরী নির্মাণের মেগা পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে।’ সব সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নতুন করে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক ও নান্দনিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
