রোগীর চাপে শয্যাসংকটে মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা। সম্প্রতি বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে। ছবি: খবরের কাগজ
ডায়রিয়া, ডেঙ্গু ও হামের উপসর্গ নিয়ে বরিশাল বিভাগের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪ হাজার ৭৭৩ জন। আর ১০ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন ২২ হাজার ৭২৪ জন। এর সঙ্গে গরমে বাড়ছে ডায়রিয়ার প্রকোপ।
তবে হাসপাতালগুলোতে রোগীর তুলনায় শয্যা ও নিবিড় পরিচর্যার পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ও শিশু বিভাগের ৭৫টি শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি থাকছে প্রায় ৪৫০ শিশু। একই রকম চিত্র দেখা যায় বরিশাল জেনারেল (সদর) হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে। সেখানেও ১৪টি শয্যার বিপরীতে ভর্তি রয়েছেন ৪০ জনের রোগী। যা শয্যার চেয়ে প্রায় তিনগুণ।
বরিশাল সদর হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ৬৭১ জন চিকিৎসা নেন। সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮৪ জনে। অর্থাৎ এক মাসে রোগী বেড়েছে ২১৩ জন বা প্রায় ৩২ শতাংশ। রোগীর চাপ সামাল দিতে ১০ শয্যার ডায়রিয়া ওয়ার্ডে আরও চারটি শয্যা বাড়ানো হয়েছে। তবু পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ জন রোগী এ ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসছেন।
বরিশাল সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শয্যা না পেয়ে কেউ মেঝেতে, কেউ বেঞ্চে বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বারান্দায়ও স্যালাইন হাতে অপেক্ষা করছেন অনেকে।
হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডের ইনচার্জ টুম্পা রানী বলেন, ‘গতকাল (বৃহস্পতিবার) বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ওয়ার্ডে ৪৫ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। প্রতিদিন ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শয্যাসংকট ছাড়া অন্য সবকিছু পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে রোগীর চাপের কারণে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল বলেন, ‘গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীর চাপও বাড়ছে। রোগীদের চিকিৎসার জন্য খাবার স্যালাইন ও ওষুধের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবে শয্যাসংকট আছে। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শহরের মধ্যে হওয়ায় ডেঙ্গু ও হামে আক্রান্ত রোগীরাও সেখানে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।’
এদিকে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানকার নবজাতক ও শিশু বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিকাশ চন্দ্র নাগ জানান, এক দিনের হিসাব অনুযায়ী, শিশু বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে ১১১ জন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ১৫৫ জন এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ৩০ শিশু ভর্তি ছিল। বাকি শিশুরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত।
তিনি আরও বলেন, ‘শিশু বিভাগে নির্ধারিত শয্যা ৭৫টি হলেও প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৫০ শিশু ভর্তি থাকছে। ফলে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হাম ও ডেঙ্গুতে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের (আইসিইউ) প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভাগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে এ ধরনের সুবিধা পর্যাপ্ত নেই। এ কারণে গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়।’
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবদুল মুনয়েম সাদ বলেন, ‘সীমিত জনবল নিয়ে রোগীদের ভর্তি ও চিকিৎসা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম ও অন্যান্য সহায়তার ঘাটতি রয়েছে।’
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওষুধ ও স্যালাইনের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাম ও ডেঙ্গু আক্রান্তদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দিতে হাসপাতালগুলোর কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হামের ঝুঁকি কমাতে শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমও চালু রয়েছে।’
