সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে ড্রোন হামলা পাল্টা হামলার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে থাকা নিয়ালা শহর এবং সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন খার্তুম বিমানবন্দর লক্ষ্য করেও একাধিক হামলা চালানো হয়েছে।
এরই মধ্যে বিতর্কিত আবেই অঞ্চলের একটি বাজারে সুদানের সেনাবাহিনীর ড্রোন হামলায় ১৫৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দক্ষিণ সুদানের কর্মকর্তারা। সুদানের সীমান্ত ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধে রক্তক্ষয়ী এক সপ্তাহের মধ্যে এটি সর্বশেষ প্রাণঘাতী হামলা।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনের হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৫০ ছাড়িয়েছে। এতে সুদানের চলমান যুদ্ধে আকাশপথে হামলার ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফের মধ্যে এই যুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে দেশটিতে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদেশি শক্তিগুলো।
আবেই অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত তথ্যমন্ত্রী ইয়োহানা আকোল ন্গর মঙ্গলবার রয়টার্সকে জানান, সোমবার আবেইয়ের বাজারে চালানো হামলায় নিহতের সংখ্যা ৭৩ থেকে বেড়ে ১৫৩ হয়েছে। তবে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
ন্গর বলেন, 'আগুন এখনো জ্বলছে। নিহতদের মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ।' তিনি জানান, আগুনে পুড়ে কিছু মরদেহ সম্পূর্ণ ছাই হয়ে গেছে।
গতকাল ২০ অক্টোবর ঘটনাস্থলে ধারণ করা এবং রয়টার্সের যাচাই করা একটি ভিডিওতে আগুনে পুড়ে যাওয়া ও দুমড়েমুচড়ে যাওয়া যানবাহন এবং ভবনের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। একটি ভবন থেকে তখনো আগুনের শিখা বের হচ্ছিল। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করতে দেখা যায়।
ন্গর এই হামলার জন্য সুদানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করলেও তার পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর একজন মুখপাত্র তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি।
তিনজন কূটনৈতিক সূত্র, একজন ত্রাণকর্মী এবং সংঘাতবিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলায় বাজারের একটি জ্বালানির গুদাম আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলেছে, এর আগে আরএসএফ তাদের যোদ্ধাদের জন্য জ্বালানি সরবরাহে গুদামটি ব্যবহার করত। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও আরএসএফের একজন মুখপাত্র তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি।
তেলসমৃদ্ধ আবেই নিয়ে বিরোধ
২০১১ সালে সুদান থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে দক্ষিণ সুদান। এরপর থেকে তেলসমৃদ্ধ আবেই অঞ্চলের মালিকানা দাবি করে আসছে দুই দেশ। অঞ্চলটি যৌথভাবে পরিচালিত হয়। আবেইয়ের সীমান্ত সুদানের কর্দোফান অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। চলমান যুদ্ধে কর্দোফান এখন অন্যতম প্রধান সংঘাতকেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
সুদানের সেনাবাহিনী-সমর্থিত সরকারের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেছেন, আবেইয়ের কিছু এলাকায় আরএসএফ সক্রিয় রয়েছে। তবে ন্গর ওই অঞ্চলে আরএসএফের উপস্থিতির কথা অস্বীকার করেছেন। রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে দুই পক্ষের দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন আবেই নিরাপত্তা বাহিনী মে মাসে সতর্ক করে বলেছিল, আবেইয়ে আরএসএফের উপস্থিতি ওই অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়েছে। বিতর্কিত অঞ্চলটির চূড়ান্ত মর্যাদা নির্ধারণে বিলম্বের কারণে বেসামরিক নাগরিক ও জাতিসংঘের কর্মীরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন বলে জানায় সংস্থাটি।
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক বলেছেন, আবেইসহ বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ।
নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের দুজারিক বলেন, 'সুদানজুড়ে অব্যাহত ড্রোন হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পরিণতিতে আগে থেকেই বিপর্যস্ত জনপদগুলোর ওপর এসব হামলা ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।'
মরদেহ উদ্ধারে বাধা আগুন
ন্গর রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলার কারণে সৃষ্ট আগুনের জন্য উদ্ধারকর্মীদের মরদেহ উদ্ধারে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সোমবারের বোমা হামলায় প্রায় আট হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
দক্ষিণ সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার রাতে জানায়, আবেই শহরের উত্তরে একটি বাজারে ড্রোন হামলা হয়েছে। তবে বিবৃতিতে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা কিংবা নিহতের মোট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে সুদানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে দেশটির সরকার।
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি পাঁচটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। বিস্ফোরণের পর জ্বালানির বাজারটিতে আগুন ধরে যায়।
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, 'মানুষ আহতদের সরিয়ে নিতে শুরু করে। তাদের পেট ও পায়ে বোমার টুকরোর আঘাত লেগেছিল। একটি জায়গায় আমি আগুনে পুড়ে যাওয়া ২৮টি মরদেহ দেখেছি।'
তিনি আরও বলেন, বাজারে আরএসএফ কিংবা অন্য কোনো পোশাকধারী সশস্ত্র যোদ্ধার উপস্থিতি তিনি দেখতে পাননি। ওই বাজারে জ্বালানির পাশাপাশি চিনি, আটা ও বিস্কুটের মতো পণ্যও বিক্রি হয়। এসব পণ্য পরে সুদানে পাঠানো হয়।
রক্তক্ষয়ী এক সপ্তাহ
সাম্প্রতিক সময়ে সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে ড্রোন হামলা বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে আরএসএফের নিয়ন্ত্রণাধীন নিয়ালা এবং সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন খার্তুম বিমানবন্দরেও একের পর এক হামলা হয়েছে।
রোববার সুদানের আরএসএফ-নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম কর্দোফান রাজ্যে ড্রোন হামলায় প্রায় ৮৪ জন নিহত এবং ৬৫ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয় জরুরি সাড়াদান কেন্দ্র এ তথ্য জানিয়েছে।
সোমবার সুদানের সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা খার্তুম বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে বারবার ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে চার শিশু নিহত হয়েছে।
শুক্রবার আরএসএফের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নিয়ালার একটি বাজারে হামলায় ২৩ জন নিহত এবং ৪৪ জন আহত হন বলে সেখানকার স্বেচ্ছাসেবকেরা জানিয়েছেন।
চাদের কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে, সুদানের সেনাবাহিনী তাদের ভূখণ্ডেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, চাদের ভূখণ্ড নিয়মিতভাবে আরএসএফের রসদ সরবরাহের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগস্টের শেষ দিকে জানিয়েছিল, দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
১০ অক্টোবর সুদানের মিসর সীমান্তের কাছে এক বিমান হামলায় ৭০ জনের বেশি ক্ষুদ্র পরিসরের খনি শ্রমিক নিহত হন বলে স্থানীয় একটি মানবাধিকার সংগঠন জানিয়েছে।
দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছে চিকিৎসা সংস্থা
আবেই অঞ্চলে প্রায়ই সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বী জাতিগোষ্ঠী কিংবা সশস্ত্র মিলিশিয়াদের মধ্যে সংঘর্ষের কারণে এসব ঘটনা ঘটে থাকে। সাম্প্রতিক হামলাটি কয়েক বছরের মধ্যে ওই অঞ্চলে সবচেয়ে প্রাণঘাতী। সেখানে চিকিৎসাসামগ্রী ও স্বাস্থ্যসেবারও তীব্র সংকট রয়েছে।
দক্ষিণ সুদান সরকার বলেছে, প্রতিবেশী দেশের যুদ্ধে তারা কোনো পক্ষ নেয়নি। তবে কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, আরএসএফের রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে আবেই গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহনে অঞ্চলটির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
চিকিৎসা সহায়তাদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স জানিয়েছে, তারা কাছের আমেথ বেক হাসপাতালে ২০ জনের বেশি আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিচ্ছে। আহতদের কয়েকজন দগ্ধ হয়েছেন।
হাসপাতালটিতে সংস্থাটির চিকিৎসা কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডাউয়ার বলেন, 'আমরা অস্ত্রোপচার, ক্ষতস্থানের পরিচর্যা এবং অন্যান্য জরুরি চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি।'
সংস্থাটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আনুষ্ঠানিক পাতায় প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, আহত রোগীরা ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
