সরকারবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল ও লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরাকে। রোববার দিবাগত রাতে রাজধানীর পল্লবী ও বনানী এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ। গ্রেপ্তারের পর তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে করা দায়ের মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালত ৪ দিনের রিমান্ডও মঞ্জুর করেন। তবে গ্রেপ্তারের পর সাবেক এই দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে- শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে নিয়ে গঠিত বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদের সক্রিয় সদস্য তারা। নিজেদের নামসহ বিভিন্ন নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘৃণা ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন তারা। একইসঙ্গে সাবেক সেনা প্রধান জেনারেল আজিজ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের গুপ্তচরের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিরপুর গোয়েন্দা বিভাগের পল্লবী জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক (নি:) মো. আলী আকবর বাদী হয়ে পল্লবী থানায় দায়ের করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রেপ্তার সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা ও তাদের সহযোগীরা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী প্রচার, তহবিল সংগ্রহ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের সঙ্গে জড়িত। ‘ইউনিটি কেয়ার পাবলিক পার্লামেন্ট’- নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পলাতক শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র করছিলেন তারা। এছাড়া ‘কালআজকাল ডটকম’ নামের একটি পেজের মাধ্যমে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কনটেন্ট তৈরির চেষ্টা করছিলেন তারা। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেও রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রচারের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে অবৈধ অর্থায়ন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর বিভিন্ন ধারায় অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা শ্রেণির মধ্যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা এবং এবং বিভিন্ন টকশোতে অংশগ্রহণ করে সরকারের প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রকাশ করে বিদ্বেষ সৃষ্টি করেছে। তারা মূলত রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কাজে নিয়োজিত। তাদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি গুপ্তচরের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের ২৭শে নভেম্বর নির্বাচনের প্রাক্কালে দেড় শতাধিক অবরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে গণভবনে গিয়ে তারা শেখ হাসিনার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ১০১ জন অবরপ্রাপ্ত সেনা কর্মতাদের নিয়ে গঠিত বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদের সক্রিয় সদস্য তারা।
এদিকে রোববার দিবাগত রাতে আটকের পর গতকাল তাদেরকে পল্লবী থানায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল বিকাল ৫টার দিকে সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নেয়া হয়। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে কড়া পুলিশি নিরাপত্তায় হাজতখানা থেকে তাদেরকে এজলাসে হাজির করা হয়। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি’র সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের পরিদর্শক শেখ বশির আহমেদ সাবেক সেনা কর্মকর্তা দেবাশীষ ও গুলশান আরাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, মামলার অন্য আসামিদের নাম-ঠিকানা ও অবস্থান শনাক্ত করা, দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই, ডিজিটাল আলামত উদ্ধার, আসামিদের পরিচালিত অন্য কোনো ওয়েবসাইট বা পেজের সন্ধান এবং ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করা একান্ত প্রয়োজন। একইসঙ্গে রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে অংশগ্রহণ করে বৈঠকে তারা দেশকে অস্থিতিশীল করার বিভিন্ন কূটচক্রে যুক্ত। এ ছাড়া আরও নানাবিধ উপাদান পাওয়া গেছে। তাদের রিমান্ড আবেদন করছি। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মনসুর ও মোহাম্মদ মশিউর রহমান রিমান্ড আবেদন বাতিলের আর্জি জানান। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত চারদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদেশ দেন।
এ বিষয়ে ডিএমপি’র পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন বলেন, ডিবি পুলিশের একজন পরিদর্শক বাদী হয়ে সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে আমাদের থানায় মামলা করেছেন। সেই মামলাতেই তাদেরকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পুরো বিষয়টিই ডিবি তদন্ত করছে।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মামলায় লেফটেন্যান্ট (অব.) গুলশান আরাকে এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দেবাশীষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোববার রাতে অভিযান চালিয়ে তাদেরকে রাজধানী থেকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা।
