জনবল ঘাটতির কারণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর চুক্তি করে কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি সম্পন্ন করে। সম্প্রতি পাবনার আতাইকুলার বামনডাঙ্গা গামে। ছবি: খবরের কাগজ
পাবনায় গবাদিপশুর চিকিৎসায় বাড়ছে হাতুড়ে চিকিৎসকদের (কোয়াক ডাক্তার) দৌরাত্ম্য। সরকারি পশু চিকিৎসকের সংকট ও পর্যাপ্ত সেবার অভাবে তাদের দ্বারস্থ হচ্ছেন খামারিরা। তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়েই অনেকে নিজেদের পশু চিকিৎসক পরিচয় দিচ্ছেন। নানা ধরনের ইনজেকশন ও ওষুধের নামে খামারিদের কাছ থেকে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। ভুল চিকিৎসা ও যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে পশুর স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন খামারিরা। সেই সঙ্গে নিরাপদ দুধ ও মাংস উৎপাদন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বামনডাঙ্গা গ্রামের কৃষক আবু সাঈদ প্রধান আড়াই লাখ টাকা দামের দুধেল গাভির চিকিৎসা করিয়েও সুস্থ করতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘গাভিটি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যায়। পাশের বাজার থেকে স্থানীয় এক পশু ডাক্তারকে বাড়িতে নিয়ে আসি। এক সপ্তাহে দুই-তিন দফায় চিকিৎসা ও ওষুধ বাবদ মোট ১৩ হাজার টাকা দিতে হয়। তবু গাভি সুস্থ হয়নি। পরে ওই ডাক্তার জানান, এ গরু আর ভালো হওয়ার নয়। শেষ পর্যন্ত গাভিটি মাত্র ৬০ হাজার টাকায় কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দিয়েছি।’
দুই খামারির কেউই জানেন না, তাদের গাভিকে কী ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল বা ওষুধের দাম কত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই চিকিৎসকের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা চিকিৎসার অনুমতি নেই। তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়েই তিনি পশু চিকিৎসা শুরু করেছেন।
আরও পড়ুন
পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী শুধু সদর উপজেলাতেই তিন শতাধিক কোয়াক ডাক্তার রয়েছেন। প্রাণিসম্পদ বিভাগের জনবল ঘাটতির সুযোগ নিয়ে তারা এভাবেই প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য খামার পরিচালনা ও পরিচর্যা বিষয়ে তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেয়। এর উদ্দেশ্য, প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা নিজেদের খামারের প্রাথমিক পরিচর্যা করবেন। কিন্তু অনেকে খামার না করে এলাকায় ওষুধের দোকান খুলে পশু চিকিৎসা শুরু করেছেন। কেউ কেউ কৃত্রিম প্রজনন বা এআই প্রশিক্ষণের সাইনবোর্ড ঝুলিয়েও চিকিৎসা দিচ্ছেন।
চাটমোহর, ভাঙ্গুরা, সাঁথিয়া, সুজানগর ও বেড়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব হাতুড়ে চিকিৎসক মোটরসাইকেলে ব্যাগ ঝুলিয়ে বাড়ি বাড়ি যান। তাদের কেউ আগে ডাকপিয়ন, হোটেলকর্মী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। ভুল চিকিৎসায় গবাদিপশু মারা যাওয়ার কথাও জানান অনেকে।
ফরিদপুর উপজেলার রতনপুর গ্রামের দুগ্ধ খামারি হযরত আলী জানান, তারা মিল্ক ভিটার চুক্তিবদ্ধ খামারি হলেও প্রয়োজনের তুলনায় কম চিকিৎসাসেবা পান। ফলে গ্রামের হাতুড়ে চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করতে হয়।
অন্যদিকে বামনডাঙ্গা গ্রামের খামারি সাদেক আকন্দ ও আবু সাঈদ জানান, তারা মিল্ক ভিটার খামারি নন। তাই কোয়াকদের ওপর নির্ভর করতে হয়। একটি ইনজেকশন দিতেই তারা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা নেন।
পাবনা সদর উপজেলার মালিগাছা ইউনিয়নের ‘পশু ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত শামীম হোসেন, আবুল হাশেম ও মোরশেদ আলী জানান, তারা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। গবাদিপশুর ছোটখাটো রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন তারা। তাদের
দাবি, সাধারণত প্রাণিসম্পদ বিভাগের চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা দেন। কোনো পশুর অবস্থা জটিল মনে হলে উপজেলা বা জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে পাঠান।
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ডা. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার উদ্বেগের বিষয়। এতে দুধ ও মাংসে ওষুধের অবশিষ্টাংশ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু তালেব খান বলেন, ‘জনবলসংকটের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির প্রতারক পশু চিকিৎসক পরিচয়ে ব্যবসা করছেন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তিন মাসের প্রশিক্ষণ পশু চিকিৎসার যোগ্যতা নয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা শুধু নিজের খামারে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারেন। তাদের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী পাবনায় গরু ৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৮টি, মহিষ ১৫ হাজার ৯১৬টি, ছাগল ৭ লাখ ৮ হাজার ৭৬৭টি এবং ভেড়া ৫৬ হাজার ২৩০টি। জেলায় নিবিড় গাভির খামার ৪ হাজার ৮৭৪টি এবং অনিবিড় খামার ৭ হাজার ৪৯১টি।
