থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে সম্প্রতি সমাপ্ত ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় বক্তব্য উপস্থাপনকালে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেছেন, আগামী এক থেকে দেড় দশকের মধ্যে বিশ্বে ৮০ কোটি কর্মসংস্থান ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এই সময় বিশ্ব শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে ১২০ কোটি তরুণ-তরুনী। অথচ একই সময়ে বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে মাত্র ৪০ কোটি চাকরিপ্রার্থী। অবশিষ্ট ৮০ কোটি চাকরিপ্রার্থী কোন ধরনের মানসম্পন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে এটি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। বিশ্বব্যাংক প্রধান বলেন, চাকরি শুধু একটি পরিসংখ্যান মাত্র নয়, এটি মানুষের মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ব্যাপক পরিসরে সবার জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। উন্নত দেশগুলো তাদের জনশক্তির জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলেও উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলো এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। তিনি আরো বলেন, সংঘাত, সরকারের আর্থিক ক্ষমতা সংকুচিত হওয়া, ঋণের বোঝা বৃদ্ধি, জ্বালানি তেল ও সারের মূল্যবৃদ্ধির মতো সমস্যা নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এখন এগিয়ে চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার করতে হবে এবং যে কোনভাবেই হোক উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ব্যাপক ভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিবর্তে প্রোডাক্টিভ প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে শ্রমবাজারে আগত কর্মসংস্থানপ্রার্থীদের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়।
অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, আগামীতে যেসব দেশ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পরিবর্তনশীল ধারাকে তাদের উন্নয়নের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে কর্মসংস্থানের তারাই সফলতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হবে। বিশ্বব্যাপী চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ব্যবহারের ক্ষেত্রে তেমন কোন উপলব্ধি নেই। অথচ আগামীতে বিশ্বব্যাপী চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ব্যাপক প্রসার ঘটবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নে প্রচলিত ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল ব্যবহারে যে সব দেশ ব্যর্থ হবে তারা উন্নয়নের প্রতিযোগিতা থেকে ছিঁটকে যাবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিবিড়ভাবে যুক্ত। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হচ্ছে একটি সামগ্রিক রূপান্তর আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হচ্ছে সেই সেই রূপান্তরের মূল চালিকা শক্তি। অতীতে কম্পিউটার শুধু মানুষের দেয়া নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতো। কিন্তু চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই’র কারণে মেশিন নিজেই শিখতে পারে, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কোন সিদ্ধান্ত একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য মঙ্গলজনক হবে কোন্ সিদ্ধান্ত ক্ষতিকর হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেই নির্দেশনা দিতে পারে। কাজেই আগামীতে যারা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারবে তারাই উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকবে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ অনূর্ধ্ব বয়সী বিলিয়নিয়ারদের মধ্যে প্রতি দশজনের মধ্যে ৭ জনই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ক্ষেত্রে সহজেই অনুধাবন করা যায়, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তারা কতটা এগিয়ে আছে।
প্রতিবারই শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমবাজারে তার প্রভাব পড়ে। আগে মনে করা হতো, কর্মীর হাত ছাড়া কর্মীই উৎপাদন কার্যের সবচেয়ে বড় বাহন। ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যে প্রথম শিল্প বিপ্লব সাধিত হলে বাষ্পীয় ইঞ্জিন এবং যন্ত্রভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা শুরু হয়। মানুষের পুরনো ধারণা একেবারে বদলে যায়। এই সময় বাষ্পচালিত ইঞ্জিন এবং টেক্সটাইল শিল্পের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। ট্রেন ও জাহাজের গতি বাড়ানোর জন্য বাষ্পীয় ইঞ্জিন ব্যবহার শুরু হয়। যারা কায়িক পরিশ্রম করতো তাদের অনেকেই কর্মচ্যুৎ হন। দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব শুরু হয় ১৮৭০ সালে এবং তা স্থায়ী হয় ১৯১৪ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের মূল উপকরণ ছিল বিদ্যুতের আবিষ্কার। বিদ্যুতের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়। ফলে কারখানাগুলোতে দিবারাত্রি ২৪ ঘন্টা কাজ করার পরিবশে সৃষ্টি হয়। তৃতীয় শিল্প বিপ্লব, যাকে ডিজিটাল বিপ্লবও বলা হয় ১৯৬০ এর দশক থেকে। তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে কম্পিউটার প্রযুক্তি। কম্পিউটার প্রযুক্তি মানুষের পরিশ্রমকে নিরাময় করেছে। কাজের গতি বাড়িয়েছে। কম্পিউটার প্রযুক্তি আসার পর প্রাথমিকভাবে অনেকেই চাকরিচ্যুৎ হয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে কম্পিউটার জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে কর্ম প্রত্যাশিরা তাদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে নিয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ২০১০ সাল থেকে শুরু হয়ে এখনো চলমান রয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এখনো বিকাশের প্রাথমিক পর্যায় বা বিকাশের অবস্থায় রয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগ করতে হলে আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞানে জাতিকে সমৃদ্ধ করতে হবে।
