ফোন্নাফা ফেত্তাখু, স্টুডেন্ট লোন ফান্ড থেকে নেয়া ঋণ শোধ করতে আঁকছেন কই মাছের ছবি। রঙিন এই মাছ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় হাজার বছর ধরে সৌন্দর্যবর্ধনকারী মাছ হিসেবে জনপ্রিয়। এ মাছেরই ১ হাজার ছবি আঁকার লক্ষ্য পিমের, প্রতিটি বিক্রি করছেন নির্দিষ্ট দামে
ঋণ শোধ করতে মানুষ কত পথই না খোঁজে। কেউ বাড়তি কাজ করেন, কেউ সঞ্চয়ে হাত দেন। থাইল্যান্ডের তরুণ শিল্পী পিম বেছে নিয়েছেন নিজের পছন্দের কাজই। পরিবার এবং স্বামী—সবাই চেয়েছেন সহায়তা করতে। কিন্তু রাজি হলেন না শিল্পী পিম। সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের সৃষ্টিশীল দক্ষতাকেই কাজে লাগাবেন উচ্চশিক্ষার জন্য নেয়া ঋণ মুক্ত হতে। বিক্রির জন্য আঁকবেন ১ হাজার ছবি, তা-ও শুধু একটি থিমেই। তবে সেগুলোর একটি চিত্রকর্ম অন্যটির সঙ্গে মিলবে না। কাজটি একদিকে যেমন শ্রমসাধ্য, তেমনি অনেকে প্রশ্ন তুললেন এটা তো সৃষ্টিশীল শিল্পের ধারণার বিপরীত!
তবে সমালোচনায় থেমে যাননি পিম। তার পুরো নাম ফোন্নাফা ফেত্তাখু। স্টুডেন্ট লোন ফান্ড থেকে নেয়া ঋণ শোধ করতে তিনি আঁকছেন কই মাছের ছবি। রঙিন এই মাছ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় হাজার বছর ধরে সৌন্দর্যবর্ধনকারী মাছ হিসেবে জনপ্রিয়। এ মাছেরই ১ হাজার ছবি আঁকার লক্ষ্য পিমের, প্রতিটি বিক্রি করছেন নির্দিষ্ট দামে।
পিমের এ প্রকল্পের শুরু কোনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থেকে নয়, কিংবা জনপ্রিয় হওয়ার আশাও তার ছিল না। বরং নিজের যে প্রতিভা আছে সেটাই কাজে লাগিয়ে ঋণ শোধ করার সংকল্প থেকেই এর সূচনা। খরচ ও সম্ভাব্য হিসাব-নিকাশ করে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, একই দামে বিক্রির জন্য এক হাজার চিত্রকর্ম তৈরি করবেন।
শিল্পীর ফেসবুক থেকে
শুধু পরিশ্রম নয়, এই দীর্ঘ যাত্রায় পিমকে সমালোচনারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। তার কয়েকজন শিক্ষক ও বন্ধু মনে করতেন, একই ধরনের ছবি বারবার আঁকা কেবলই 'বাণিজ্যিক কাজ', যা একজন শিল্পীকে বড় শিল্পী হয়ে উঠতে দেয় না। কিন্তু হাল ছেড়ে দেয়ার বদলে এসব মন্তব্যই তার অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়। তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করেন—‘একজন শিল্পী কেন নিজের প্রিয় কাজকে ঘিরে স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে পারবেন না?’
এমনকি স্বামীও তার শিক্ষা ঋণ পরিশোধ করার প্রস্তাব দেন। তবুও পিম নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন। পণ করেছিলেন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেই এই ঋণ শোধ করবেন।
শিল্পীর ফেসবুক থেকে
পিম এখন পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক কই চিত্র এঁকেছেন, যার বেশিরভাগ বিক্রি হয়ে গেছে। প্রতিটি নতুন ছবিকে আগেরটি থেকে আলাদা করে তুলতে তিনি কখনো কখনো বিভিন্ন উপাদান যুক্ত করেছেন—যেমন পাহাড়, উল্কা, তিমি কিংবা বিড়াল। এসব উপাদানে ফুটে উঠেছে তার সেই সময়কার অনুভূতি ও জীবনের গল্প। আবার পরিবর্তন এনেছেন চিত্রকর্মের প্যাটার্নেও।
পিমের কাছে প্রতিটি চিত্রকর্ম কেবল একটি ছবি নয়; এটি তার অনুভূতি, অভিজ্ঞতা এবং একজন শিল্পী হিসেবে বেড়ে ওঠার দলিল। যে সময় তিনি পাহাড় ও উল্কার ছবি আঁকতেন, তা ছিল তার একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতার প্রতিফলন।
শিল্পীর ফেসবুক থেকে
সময়ের সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন, শিল্প সৃষ্টির প্রতি তার ভালোবাসা অটুট। একই সঙ্গে দেখেছেন, অসংখ্য মানুষ তার কাজের প্রশংসা করছেন, এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিচ্ছেন।
শিল্প দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব—এটি প্রমাণ করার ইচ্ছা থেকে এক তরুণ শিল্পীর উদ্যোগ দিন শেষে শুধু ঋণ শোধের পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র এক আত্ম-অন্বেষণের যাত্রা।
