প্রতিনিধি, হবিগঞ্জ · ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ৩:০১ অপরাহ্ন
বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। হাঁটতে গেলেও কষ্ট হয়। পরনের কাপড় জীর্ণ, চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। অথচ এই বয়সেও প্রতিদিন ঘর থেকে বের হতে হয় তাঁকে। কখনো শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনের প্ল্যাটফর্মে, কখনো মানুষের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে হাত পাতেন। উদ্দেশ্য একটাই, দিন শেষে অন্তত খাবার জোটানো।
৯০ বছর বয়সী সাফিয়া বেগমের জীবনের গল্প এখন অভাব আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প। স্বামী নেই, একমাত্র ছেলে থেকেও যেন নেই। মেয়ের সংসারে আশ্রয় মিললেও সেখানে অভাবের টানাপোড়েন। তাই বয়সের কারণে শরীর আর আগের মতো চলতে না চাইলেও ভিক্ষার ঝুলি হাতে বের হতে হয় তাঁকে।
সাফিয়া বেগমের বাড়ি হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার ধানি মহল্লায়। বর্তমানে তিনি মেয়ের সঙ্গে থাকেন। তার ছেলে ভবঘুরে জীবনযাপন করেন বলে মায়ের দেখাশোনা করতে পারেন না। অন্যদিকে মেয়ের সংসারেও আর্থিক সংকট। নিজেদের প্রয়োজন মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে বৃদ্ধা মায়ের বাড়তি খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে কথা হয় সাফিয়া বেগমের সঙ্গে। নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। জানান, অভাবের কারণে নিজের প্রয়োজন মেটাতে অন্যের কাছে হাত পাততে হচ্ছে তাকে।
সাফিয়া বেগম বলেন, ‘ছেলে থেকেও নেই। সে এক জায়গায় থাকে না, নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। আমার দেখাশোনা করার কেউ নেই। তাই মেয়ের কাছে থাকি। তার সংসারেও অনেক অভাব। তারা নিজেরাই ঠিকমতো চলতে পারে না। আমি তাদের ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। তাই শরীর না চললেও ভিক্ষা করতে বের হই।’
দিনের উপার্জনই তার খাবারের ভরসা। কখনো মানুষের কাছ থেকে কিছু টাকা পান, কখনো খাবার জোটে, কখনো জোটে না। বিভিন্ন মাজারেও যান তিনি। সেখানে নামাজ পড়েন, তসবি পাঠ করেন। কেউ সাহায্য করলে সেই টাকা দিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করেন।
কথা বলার সময় তার পরনের ছেঁড়া কাপড়টিও চোখে পড়ে। বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পড়া এই নারীর কাছে নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। নিজের প্রয়োজনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘গায়ের কাপড় ছিঁড়ে গেছে। টাকা নেই, নতুন কাপড় কিনতে পারি না। কেউ একটা নতুন কাপড়ও দেয় না। আমার আর কী চাওয়া আছে? একটা কাপড় আর দুবেলা খাবার হলেই হয়। বয়স হয়ে গেছে, শরীর চলে না। কিন্তু অভাব তো বয়স বোঝে না, পেট তো খাবার চায়।’
বয়সের কারণে নিয়মিত কাজ করে আয় করার সুযোগ নেই সাফিয়া বেগমের। এই পরিস্থিতিতে সরকারি বয়স্ক ভাতা পেলে অন্তত খাবারের জন্য মানুষের কাছে হাত পাতার চাপ কিছুটা কমবে বলে মনে করেন তিনি।
সাফিয়া জানান, সরকারি ভাতার কার্ড পাওয়ার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেছেন। বিভিন্নজনের কাছে গিয়েছেন, কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা হয়নি। তিনি বলেন, ‘একটা সরকারি ভাতার কার্ড যদি পাইতাম, তাহলে অনেক উপকার হতো। অন্তত প্রতিমাসে কিছু টাকা পেতাম। মানুষের কাছে এভাবে হাত পাততে হতো না।’
সাফিয়া বেগমের চাওয়া খুব বেশি নয়। পরার মতো একটি ভালো কাপড়, নিয়মিত দুবেলা খাবার আর বার্ধক্যে সামান্য আর্থিক নিরাপত্তা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার কাছে এসব মৌলিক প্রয়োজনই এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া।
গুগলে আমাদের খবর পেতে
