চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে জৈবসার প্রয়োগের পর দুই বিঘা জমির শসার চারা নষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষক সমির উদ্দিন। ধারদেনা ও ঋণের টাকা বিনিয়োগ করে চাষাবাদ করা এ কৃষক এখন আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় দিশেহারা। তাঁর অভিযোগ, ডিলারের পরামর্শে ‘প্যারাগন’ ব্র্যান্ডের জৈবসার কিনে জমিতে প্রয়োগ করার পরদিন থেকেই চারার গোড়ায় পচন ও গাছের দুর্বলতা দেখা দেয়। পরে জমির সব চারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জমি ও ডিলারের দোকান থেকে জৈবসারের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। নমুনাগুলো পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে পরীক্ষার ফল না আসা পর্যন্ত সারের গুণগত মান কিংবা চারাগাছ নষ্ট হওয়ার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সরেজমিনে জানা যায়, ভোলাহাট উপজেলার ৩ নম্বর দলদলী ইউনিয়নের খড়কপুর গ্রামের কৃষক সমির উদ্দিন শীতকালীন শসা চাষের জন্য দুই বিঘা জমিতে চারা রোপণ করেন। ভালো ফলনের আশায় গত ১৪ অক্টোবর একই ইউনিয়নের আলীমোড় এলাকার ‘মেসার্স মনিরুল ট্রেডার্স’ থেকে প্রতি বস্তা ৪৫০ টাকা দরে ‘প্যারাগন’ ব্র্যান্ডের তিন বস্তা জৈবসার কেনেন। ওই দিনই জমিতে সার প্রয়োগ করেন তিনি।
কৃষকের ভাষ্য, পরদিন ১৫ অক্টোবর জমিতে গিয়ে চারার গোড়ায় পচন ও গাছের দুর্বলতা দেখতে পান। পরে জমি ঘুরে দেখেন, সব চারাই নষ্ট হওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে।
কৃষক সমির উদ্দিন বলেন, “ধারদেনা করে, ঋণের কিস্তি ও মহাজনের কাছ থেকে দাদনে টাকা নিয়ে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ করে শসার চাষ করেছিলাম। আশা ছিল, ভালো ফলন হলে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা মুনাফা করতে পারব। সেই টাকা দিয়ে দেনাপাওনা পরিশোধ করব। কিন্তু এখন আমার সব শেষ হয়ে গেল। এ বছর আর শসার চাষ করতে পারব কি না, জানি না।”
তিনি আরও বলেন, “আগের দেনাই পরিশোধ করতে পারিনি। এখন নতুন করে টাকা চাইলে কেউ দিতে চাইবে না। আমি কীভাবে ঘুরে দাঁড়াব—তা বুঝতে পারছি না।”
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের দাবি, জৈবসারটির ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করে তাঁর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ঘটনার খবর পেয়ে উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিদর্শন করেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সুলতান আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাইরে থাকার কথা জানান। পরে তাঁর দপ্তরের সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান, সহকারী ইউনিয়ন কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসিরুল ইসলাম, মো. মুকুল আলীসহ অন্য কর্মকর্তারা রাত আনুমানিক ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে যান।
কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত জমি ও শসার চারার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় জমিতে প্রয়োগ করা সার এবং ডিলারের দোকানে থাকা একই ব্র্যান্ডের সারের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান জানান, জমি ও ডিলারের দোকান—দুই স্থান থেকেই সারের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফল পেতে এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে।
এদিকে ডিলারের গোডাউনে থাকা অবশিষ্ট ৫৭ বস্তা প্যারাগন জৈবসার বিক্রি না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে এ নির্দেশনার লিখিত আদেশ এবং এর কার্যকারিতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কৃষক সমির উদ্দিনের অভিযোগ, ‘মেসার্স মনিরুল ট্রেডার্স’-এর মালিকের ছেলে মো. আহসান আলী তাঁকে শসার চারার গোড়ায় ওই জৈবসার প্রয়োগের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এ-সংক্রান্ত প্রমাণ তাঁর কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, মো. আহসান আলীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সার ব্যবহারের নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ না করার কারণে এমন পরিস্থিতি হয়ে থাকতে পারে। তবে সার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া এবং কৃষকের অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য জানা প্রয়োজন।
উপজেলার সন্ন্যাসীতলা মোড়ের ‘মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্স’-এর ডিলার মো. রাফিজুল ইসলাম ডাবলুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সার প্রয়োগে ত্রুটি থাকতে পারে বলে মত দেন। একই সঙ্গে প্যারাগন জৈবসারকে পরিচিত একটি ব্র্যান্ডের সার বলে উল্লেখ করেন।
প্যারাগন জৈবসারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সারটির গুণগত মান নিয়ে আস্থা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে সারটি ফসলের উর্বরতা বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। পরীক্ষায় সারের ত্রুটি প্রমাণিত হলে তাঁরা দায় নিতে প্রস্তুত বলেও জানান।
প্রায় এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে শসা চাষ করা কৃষক সমির উদ্দিনের সামনে এখন ঋণ পরিশোধ ও নতুন করে চাষাবাদ শুরুর চ্যালেঞ্জ। নমুনা পরীক্ষার ফল পেতে এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে বলে জানানো হয়েছে। এ অবস্থায় ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ, ঘটনার প্রকৃত কারণ শনাক্ত এবং দায় নির্ধারণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরীক্ষায় সারের ত্রুটি কিংবা ভুল পরামর্শের কারণে ক্ষতির বিষয়টি প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। কৃষক সমির উদ্দিনও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত দায় নির্ধারণ এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন।
এই বাংলা/এমএস
