সম্প্রতি, “পূজামণ্ডপে হিন্দুদের চেয়ে মুসলিম দর্শনার্থীই বেশি! দাড়ি-টুপি পরে কেউ কেউ এমন আচরণ করেন, যা খুব বিব্রতবোধ লাগে। আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আপনারা কেন আসেন?” শীর্ষক একটি পোস্ট বেশ ভাইরাল। ‘সিমা চক্রবর্তী’ নামক একটি ফেসবুক পেজ থেকে দেওয়া পোস্টটির ওপর নির্ভর করে অনেকেই করছেন সমালোচনা।
তবে, কে এই ‘সিমা চক্রবর্তী’? পেজটিতে প্রচারিত ছবির ব্যক্তির নামই কী ‘সিমা চক্রবর্তী’ বিস্তারিত অনুসন্ধান করেছে কালবেলা।
একের পর এক সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক পোস্ট
সমালোচনার শীর্ষে থাকা পোস্টটি করা হয় গতকাল (২০ অক্টোবর) বিকেল ৫টা ২৮ মিনিটে। পোস্টটিতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে সাড়ে আট হাজারের ওপর ফেসবুক ব্যবহারকারী। এছাড়া, মন্তব্য করা হয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি এবং পোস্টটি শেয়ার হয়েছে এক হাজারবারের বেশি। পোস্টটির মন্তব্যের ঘরে ‘সিমা চক্রবর্তী’ আবার লিখেছেন ‘পূজার ভিড়ে এক ভদ্রলোক হিন্দু মেয়েকে স্পর্শ করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল! মেয়েটিও জুতা খুলে গালে এমন ভালোবাসার ছাপ রেখে দিল, সঙ্গে পাবলিকের গণধোলাই তো বোনাস!’
এছাড়া, অন্যান্য ব্যবহারকারীদের করা মন্তব্যগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ধর্মীয় সম্প্রীতি, বাঙালির মিলনমেলাসহ সহিষ্ণু থাকার আহবান করে পক্ষে বিপক্ষে মন্তব্য করেছে।
পেজটি থেকে গত ১৪ অক্টোবর একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, “মুসলিম ভাই-বোনদের কাছে জানতে চাই? আপনারা তো মূর্তিপূজায় বিশ্বাসই করেন না, তাহলে আমাদের পূজামণ্ডপে আপনাদের কাজ কী?” এই পোস্টটিতেও ২৬ হাজারের ওপরে প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে। এছাড়া, প্রায় ২৫ হাজার মন্তব্য এবং ১৮শো-এর ওপরে শেয়ার করা হয়েছে। এই পোস্টের মন্তব্যগুলো পর্যবেক্ষণ করেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান দুর্গাপূজা শুরুর পর থেকে ধর্মীয় উস্কানিমূলক এবং সরকারের সমালোচনা করে একাধিক পোস্ট (১, ২, ৩, ৪, ৫) করতে দেখা যায় পেজটি থেকে।
যা দিচ্ছে নিজের পরিচয়
পেজটি যাত্রার শুরু থেকেই নারী নিজেকে ‘ডিভোর্সপ্রাপ্ত’ বলে প্রচার (১, ২, ৩, ৪) করে আসছেন। গত ২১ সেপ্টেম্বর এক পোস্টে নিজের একটি সন্তান আছে বলে দাবি করেন এবং সন্তানের সাথে একটি ছবি পোস্ট দেন। অর্থাৎ, তিনি দাবি করেন তার একটি সন্তানসহ ডিভোর্স হয়েছে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর আরেকটি পোস্টে তিনি এক বয়স্ক নারীর সাথে ছবি পোস্ট করে দাবি করেন, বয়স্ক নারী তার মা। গত ০৩ অক্টোবর তিনি এক পোস্টে বলেন, প্রায় দেড় বছর আগে তার ডিভোর্স হয়েছে।
গত ১২ অক্টোবর প্রচারিত একটি পোস্টে একটি ছবি যুক্ত করে দাবি করেন, ছবিতে থাকা শিশুটি তার সন্তান। শিশুটির গলায় একটি স্কুলের পরিচয়পত্র দেখা যায়। সেটিতে স্কুলের নাম দেখা যায়, ‘শেখ কুন্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। অনুসন্ধানে বাংলাদেশে এমন কোনো স্কুলের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এছাড়া, এআই ডিটেক্টর বলছে, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
পাত্র চেয়ে পোস্ট, মুসলিমদের সমালোচনা
গত ২০ সেপ্টেম্বর ‘সিমা চক্রবর্তী’ নামক পেজটি থেকে অন্তত তিনটি গ্রুপে পাত্র চেয়ে করা পোস্ট (১, ২, ৩) খুঁজে পাওয়া যায়। সেগুলোতে পরিচয় দেন, নাম- সিমা চক্রবর্তী, পিতার নাম- সুমন চক্রবর্তী, মাতার নাম- রত্না চক্রবর্তী। ঠিকানা- দিরাই, সুনামগঞ্জ। বয়স: ৩৫ বছর। শিক্ষাগত যোগ্যতা: অনার্স। বৈবাহিক অবস্থা: ডিভোর্সি। সন্তান: একজন ছেলে আছে।
এরপর গত ০৬ অক্টোবর এক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, পাত্র চেয়ে করা পোস্টগুলোতে অধিকাংশ মুসলিম ব্যক্তির নামে পরিচালিত অ্যাকাউন্ট থেকে বিয়ের আগ্রহের কথা জানানো হয়েছে। এছাড়া তিনি আরও অভিযোগ তুলেন, যদি এটি হিন্দু পাত্র-পাত্রীর গ্রুপ হয়, তাহলে সেখানে অন্য ধর্মের এত আইডি কীভাবে এবং কেন থাকে?
পেজটির যাত্রা কবে?
‘সিমা চক্রবর্তী’ নামক পেজটি গত ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে যাত্রা শুরু করে মাত্র এক মাসের মধ্যে প্রায় নয় হাজার ফলোয়ার যুক্ত হয়ে গেছে।
পেজটিতে ব্যবহৃত ছবিগুলো কার?
‘সিমা চক্রবর্তী’ নামক পেজটিতে উল্লেখ রয়েছে, সিমা চক্রবর্তী সিলেটের বাসিন্দা। দিরাই উচ্চ বিদ্যালয় এবং দিরাই ডিগ্রি কলেজ (বর্তমান দিরাই সরকারি কলেজ) থেকে পড়াশোনা করেছেন। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘সিমা চক্রবর্তী’ নামক ফেসবুক পেজটিতে যে ছবিগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে সেই নারীর নাম সিমা চক্রবর্তী নয় এবং তিনি বাংলাদেশেরও নন।
মূলত, নিতু যাদব (Nitu Yadav) নামক এক ভারতীয় নারীর ছবি, সেই নারীর স্বামী ও সন্তানের ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এর সহযোগিতায় সামান্য সম্পাদনা করে ‘সিমা চক্রবর্তী’ নামক ফেসবুক পেজটি পরিচালিত হচ্ছে।
অতএব, ‘সিমা চক্রবর্তী’ ফেসবুক পেজটি মূলত ফেক বা ভুয়া পেজ।
