স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় জমজমাট ব্যবসা করা এসব সিনেমা হল এখন দর্শকসংকটের কারণে টিকে থাকার লড়াই করছে। বছরের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকার পর কোনো কোনো হলে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়। তাতেও ব্যবসা আশানুরূপ না হওয়ায় হল মালিকদের অনেকেই বিকল্প আয়ের পথ বেছে নিয়েছেন। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং অনলাইন বিনোদনের সহজলভ্যতা সিনেমা হলের দর্শক কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঘরে বসেই পছন্দের চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ তৈরি হওয়ায় আগের মতো প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার প্রবণতা কমেছে। এর পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যয়, কর্মচারীদের বেতন এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচ সামলানোও হল মালিকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
সিকতা সিনেমা হলের মালিক মুক্তা বলেন, “আগের মতো সিনেমা হলে দর্শক হয় না। সিনেমা চালালেও কর্মচারীদের বেতন দেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। তাই সিনেমা হলটি ভেঙে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করেছি।” ক্লিওপেট্রা সিনেমা হলের মালিক ফয়সাল বিন ফরহাদ উৎসব বলেন, “একসময় আমার এই হলে সব সময় হাউসফুল থাকত। কিন্তু এখন আর আগের মতো চলে না। শুধু দুই ঈদে হলে সিনেমা চালানো হয়। শাকিব খানের সিনেমা লাগালে দর্শক আসে, অন্য নায়কদের সিনেমা লাগালে তেমন চলে না। তাই হলের বাইরের অংশটি ভাঙারির দোকান হিসেবে ভাড়া দিয়েছি।”
তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, দর্শকের পছন্দের পরিবর্তন এবং চলচ্চিত্রের ব্যবসায়িক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে প্রেক্ষাগৃহ পরিচালনার বাস্তবতা। নিয়মিত দর্শক না থাকায় বছরের অধিকাংশ সময় হল বন্ধ রাখা কিংবা বিকল্প কাজে জায়গা ব্যবহার করা ছাড়া মালিকদের সামনে কার্যকর পথ সীমিত হয়ে পড়েছে। সিনেমা হল বন্ধ হওয়ার প্রভাব পড়েছে এর সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের জীবনেও। একসময় টিকিট বিক্রেতা, প্রজেকশন অপারেটর, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অন্যান্য কর্মচারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতো এসব প্রেক্ষাগৃহে। হল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের অনেকেই কাজ হারিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
বাংলাদেশে সিনেমা হলের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৫৬ সালে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তির পর দেশীয় চলচ্চিত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন শহর ও উপজেলায় গড়ে ওঠে অসংখ্য প্রেক্ষাগৃহ। তবে পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রের ব্যবসায়িক সংকট, দর্শকসংখ্যা হ্রাস এবং বিকল্প বিনোদনমাধ্যমের বিস্তারে অনেক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যায়।
ধুনটের ক্লিওপেট্রা সিনেমা হলের বর্তমান চিত্র শুধু একটি প্রেক্ষাগৃহের দুরবস্থার গল্প নয়; এটি স্থানীয় বিনোদন সংস্কৃতির পরিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি। যে হলে একসময় দর্শকদের ভিড় জমত, সেই হলের সামনের অংশ এখন ভাঙারির মালামাল রাখার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে, ঝংকার সিনেমা হলও সীমিত সময় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
স্থানীয় চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মতে, মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ উন্নয়ন এবং দর্শকবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে সিনেমা হলের প্রতি মানুষের আগ্রহ ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। তবে এ জন্য চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, পরিবেশক ও হল মালিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ধুনটের ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হলগুলোর বর্তমান অবস্থা তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—একসময়ের জনপ্রিয় এই বিনোদনকেন্দ্রগুলো কি আবার দর্শকদের পদচারণায় মুখর হবে, নাকি সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে স্থানীয় চলচ্চিত্র সংস্কৃতির আরেকটি অধ্যায়?
The post ধুনটের ঐতিহ্যবাহী ক্লিওপেট্রা সিনেমা হল এখন ভাঙারির গোডাউন appeared first on ভোরের চেতনা.
