হুতিদের হামলায় বিপর্যস্ত সৌদি আরব , সংলাপ ও কূটনীতিই হোক সংঘাত নিরসনের পথ

……..নজরুল ইসলাম……..
মধ্যপ্রাচ্য আবারও ভয়াবহ সংঘাতের আবর্তে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে গভীর সংকটে ফেলেছে । ২০২৬ সালের অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় প্রাণহানি ও বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে । সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোও হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে। এর পাল্টায় ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে । প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রতিশোধ আর পাল্টা প্রতিশোধের শেষ কোথায়? মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ কি কখনো নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা পাবে না?
সৌদি আরব শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, পবিত্র দুই মসজিদ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি অর্থনীতির সঙ্গে দেশটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে । হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ সৌদি আরবে যান। ফলে দেশটির বিমানবন্দর, বেসামরিক স্থাপনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা কেবল সৌদি নাগরিকদের নিরাপত্তাকেই বিপন্ন করে না, বরং বিদেশি যাত্রী, শ্রমজীবী মানুষ ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। বিমান চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়ও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
কোনো রাজনৈতিক বিরোধ, আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রতিযোগিতা কিংবা সামরিক কৌশল বেসামরিক মানুষের জীবনকে বিপন্ন করার বৈধতা দিতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মৌলিক নীতি হলো—যুদ্ধের পক্ষগুলোকে বেসামরিক মানুষ ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। বেসামরিক বিমানবন্দর, হাসপাতাল, আবাসিক এলাকা ও সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তাই সৌদি আরবের বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
তবে, সংকটের গভীরতা বুঝতে হলে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। ২০১৪ সালে হুতিদের সানায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রমেই গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপ, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত ইয়েমেনের সংকটকে দীর্ঘায়িত করেছে। বছরের পর বছর যুদ্ধের কারণে দেশটির সাধারণ মানুষ খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপদ পানি ও আশ্রয়ের সংকটে ভুগেছে । নতুন করে সংঘর্ষ বাড়লে সেই মানবিক বিপর্যয় আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই সংঘাতের সঙ্গে ইরান-সৌদি আরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিও জড়িয়ে আছে। হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ও সমর্থন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে । সৌদি আরবের অভিযোগ, ইরানের সহায়তা হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে । অন্যদিকে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়। কিন্তু বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতায় ইয়েমেন কিংবা সৌদি আরবের সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মধ্যপ্রাচ্যকে প্রভাব বিস্তারের যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করার পরিণতি শেষ পর্যন্ত পুরো অঞ্চলের জন্যই বিপজ্জনক হতেপারে।
এ পরিস্থিতিতে শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে কূটনৈতিক উদ্যোগও জোরদার করতে হবে। হুতিদের অবিলম্বে সৌদি আরবের বেসামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা বন্ধ প্রয়োজন। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকেও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এড়াতে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে মেনে চল দরকার। ইরানসহ আঞ্চলিক প্রভাবশালী দেশগুলোকে উত্তেজনা প্রশমনে কাজ করা প্রয়োজন।
জাতিসংঘ, ওমান, সৌদি আরব, ইরান এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে কার্যকর যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সংলাপের পথ তৈরি করা প্রয়োজন। ইয়েমেনের জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সমাধান প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করে সাধারণমানুষ । একই সঙ্গে মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশাধিকার, বন্দিদের মুক্তি, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, সংঘাতের মূল কারণগুলোর সমাধানই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিরএকমাত্র ভিত্তি।
বাংলাদেশের মতো শান্তিপ্রিয় দেশের মানুষের কাছেও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত। যুদ্ধ ও অস্থিরতা বাড়লে তাঁদের জীবন, কর্মসংস্থান ও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে । জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার প্রভাবও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়তে পারে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধু আঞ্চলিক স্বার্থের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও মানবিক স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এখন প্রয়োজন যুদ্ধের ভাষা পরিহার করে শান্তির সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কোনো স্থায়ী সমাধান আসে না; আসে ধ্বংস, শোক ও নতুন প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা। সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, ইয়েমেনের জনগণকে যুদ্ধের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হবে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে সংঘাত উসকে দেওয়ার পরিবর্তে শান্তির পক্ষে দাঁড়াতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আর ক্ষেপণাস্ত্র নয়, উড়ুক শান্তির পায়রা; যুদ্ধের ময়দানে আর রক্তপাত নয়, প্রতিষ্ঠিত হোক সংলাপ, সহাবস্থান ও মানবিক মর্যাদা। শান্তি ফিরুক মধ্যপ্রাচ্যে—নিরাপদ হোক মানুষের জীবন, সুরক্ষিত হোক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মীও সমাজচিন্তক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
More News Of This Category

