রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-৫/১ এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, অনুমোদনহীন ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবনের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে দায়িত্ব প্রাপ্ত অথরাইজড অফিসার সাইদা ইসলামের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও কয়েক জন বাড়ির মালিকের অভিযোগ, কোথাও মোবাইল কোর্টের অভিযান সীমাবদ্ধ থাকছে প্রতীকী ব্যবস্থায়, কোথাও ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে, আবার নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবির অভিযোগও সামনে এসেছে।
এমনকি অনুমোদনের অর্থের একটি অংশ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে দিতে হয় বলে তিনি দাবি করেছেন-এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন বাড়ির মালিক। রাজউকের অনুমোদন ও তদারকি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে তাদের এই অভিযোগকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, অনুমোদনহীন ভবন নির্মাণ বন্ধে রাজউকের নির্ধারিত আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথ ভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।
কয়েকটি ক্ষেত্রে জরিমানা, আইনানুগ ভাঙার নির্দেশ কিংবা প্রয়োজনীয় পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে বিদ্যুৎ বা অন্যান্য সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, মিটার খুলে নেওয়া কিংবা অস্থায়ী সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার মধ্যেই অভিযান সীমাবদ্ধ থাকছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তাদের প্রশ্ন, এসব পদক্ষেপের পরও যদি অনুমোদনহীন নির্মাণ অব্যাহত থাকে, তাহলে অভিযানের কার্যকারিতা কতটুকু? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিযোগকারী বলেন, ‘কিছু নির্দিষ্ট ভবন মালিকের ক্ষেত্রে অভিযান হয় কেবল কাগজে-কলমে। অন্যদিকে, অনুমোদনহীন নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য মূলক আচরণের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ জানাতে গেলেও ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হতে হয় বলে অনেকে দাবি করছেন।’ অভিযোগকারীদের আরো দাবি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় ইন্সপেক্টর ও ফিল্ড স্টাফদের কার্যক্রমেও হস্তক্ষেপ করা হয়। কোনো ইন্সপেক্টর আইনগত ব্যবস্থা নিতে চাইলে তাকে ‘আমাকে ছাড়া কিছু করবেন না’-এমন কথা বলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বিভিন্ন পক্ষের কাছে ভিন্ন বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরির অভিযোগও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি, অভিযান প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। নকশা অনুমোদনে ৫-৬ লাখ টাকা দাবির অভিযোগ মোবাইল কোর্ট পরিচালনার অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি ভবনের নকশা অনুমোদন পেতে বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবির অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন বাড়ির মালিক। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ থেকে ছয়তলা ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রেও পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। ভবন ছয়তলার হোক কিংবা ১০ থেকে ১২ তলার-অনুমোদন সংক্রান্ত কাজে পাঁচ লাখ টাকার নিচে অর্থ চাওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
এক বাড়ির মালিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ছয়তলা ভবনের নকশা অনুমোদন করাতেই যদি পাঁচ লাখ টাকা দিতে হয়, তাহলে রাজউকের সরকারি ফি ও অন্যান্য নির্মাণ ব্যয় মিটিয়ে ভবন নির্মাণ করবো কীভাবে? অনুমোদনের জন্যই যদি এত টাকা ব্যয় করতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ ভবন নির্মাণের খরচ বহন করবে কীভাবে?’ বাড়ির মালিকদের অভিযোগ, অনুমোদনের জন্য সরকারি নির্ধারিত ফি ও অন্যান্য বৈধ খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থের দাবি তাদের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে অভিযোগে উল্লিখিত অর্থের পরিমাণ, দাবির ধরন এবং অর্থ লেনদেনের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট ফাইল, নথি ও প্রত্যক্ষ প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। ‘টাকা একা আমার পকেটে যায় না’-ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের নাম জড়িয়ে অভিযোগ সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হলো, নকশা অনুমোদনের অর্থের একটি অংশ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে দিতে হয় বলে সাইদা ইসলাম বাড়ির মালিকদের কাছে দাবি করেছেন-এমন বক্তব্য দিয়েছেন কয়েকজন অভিযোগকারী। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফাইল অনুমোদনের জন্য অর্থের পরিমাণ নিয়ে আলোচনার সময় তিনি বলেছেন, ‘এই টাকা একা আমার পকেটে যায় না, পরিচালক থেকে শুরু করে ওপরের মহলেও দিতে হয়।’
অভিযোগকারীদের দাবি, ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থ না দিলে তারা সন্তুষ্ট হন না-এমন যুক্তি দেখিয়েই পাঁচ লাখ টাকার নিচে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করা হয় বলে তারা অভিযোগ করছেন। তবে এই বক্তব্যের সত্যতা, কথিত অর্থের প্রকৃত গন্তব্য এবং কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে অভিযোগটিকে প্রমাণিত দুর্নীতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে অভিযোগটি সত্য হলে তা কেবল একজন কর্মকর্তার ভূমিকা নয়, রাজউকের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য অনিয়ম ও জবাবদিহির ঘাটতি নিয়েও গভীর তদন্তের দাবি তৈরি করে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে-অনুমোদনের জন্য সরকারি ফি নির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ কেন উঠছে? কোনো কর্মকর্তা যদি ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে অর্থ দেওয়ার কথা বলে থাকেন, তাহলে সেই দাবির পেছনে কী তথ্য বা প্রমাণ রয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি অভিযোগকারী বাড়ির মালিকদের বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা জরুরি। সাইদা ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জোন-৫/১-এর নকশা অনুমোদন ও ভবনসংক্রান্ত ফাইল নিষ্পত্তির গতি নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তার আইডিতে অর্ধশতাধিক ফাইল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে হাতে গোনা কয়েকটি ফাইলের অনুমোদন সম্পন্ন হয়েছে; বিপরীতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আবেদন এখনো ঝুলে আছে। বাড়ির মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে এবং অতিরিক্ত আর্থিক চাহিদা পূরণ না হলে ফাইল সহজে এগোয় না।
তবে ফাইলের প্রকৃত সংখ্যা, কতটি অনুমোদিত হয়েছে, কতটি ফেরত গেছে এবং কতটি কোন কারণে আটকে রয়েছে-এসব তথ্য এখনো নথিভিত্তিকভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, অর্ধশতাধিক ফাইল যদি সত্যিই নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকে, তাহলে সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকার কারণ কী? আবেদনগুলোর কোনোটিতে নথির ঘাটতি রয়েছে, কোনোটিতে কারিগরি জটিলতা আছে, নাকি প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এর কারণ-তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। ফাইলভিত্তিক অগ্রগতি, আবেদন গ্রহণের তারিখ এবং নিষ্পত্তির সময়সীমা প্রকাশ করা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
রাজউকের এক সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মোবাইল কোর্ট একটি কঠোর আইনগত প্রক্রিয়া। সেখানে দায়সারা অভিযান বা প্রতীকী ব্যবস্থা গ্রহণ দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ ধরনের অভিযোগ উঠলে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করা জরুরি।’ স্থানীয় বাসিন্দা ও নির্মাণপেশাজীবীদের দাবি, অনুমোদনহীন নির্মাণ বন্ধে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি নকশা অনুমোদন ও ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট ফাইল, অভিযান প্রতিবেদন, সরকারি ফি ও অনুমোদনসংক্রান্ত রেকর্ড পরীক্ষা করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ করা জরুরি। বক্তব্য চাইলে বিধিবিধানের দোহাই, বিষয়টি এড়িয়ে যান সাইদা ইসলাম প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে রাজউকের জোন-৫/১-এর অথরাইজড অফিসার সাইদা ইসলাম সরাসরি বক্তব্য না দিয়ে বিভিন্ন নিয়মনীতি ও বিধিবিধানের প্রসঙ্গ তুলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। নকশা অনুমোদনে অর্থ দাবির অভিযোগ, ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় অনিয়মের মতো গুরুতর বিষয়গুলোতে তার সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট করা জরুরি। অভিযোগগুলোর জবাব না দিয়ে বিধিবিধানের প্রসঙ্গ তুলে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি তার জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজউকের জনসংযোগ শাখার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের অভিযোগ লিখিতভাবে জমা পড়লে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে অভিযোগ কারীদের দাবি, মৌখিকভাবে একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও তারা কার্যকর প্রতিকার পাননি।
সব মিলিয়ে রাজউকের জোন-৫/১-এর মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, ভবনের নকশা অনুমোদন এবং ফাইল নিষ্পত্তি নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। অর্ধশতাধিক ফাইলের প্রকৃত অবস্থা, অনুমোদন সংক্রান্ত সরকারি ফি, অভিযানের কার্যকারিতা এবং অর্থ দাবির অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টির স্বচ্ছ নিষ্পত্তি সম্ভব।
বিআলো/অর্নব