পৃথিবীতে প্রাকৃতিকভাবে যেসব পরমাণু পাওয়া যায়, তার বেশির ভাগ স্থিতিশীল। এসব পরমাণু যে মৌল হিসেবে তৈরি হয়েছিল, আজও সেই মৌল হিসেবেই টিকে আছে। এদের কোনোটা তৈরি হয়েছিল মহাবিশ্বের জন্ম মুহূর্তের মহাবিস্ফোরণের সময়। কোনোটা তৈরি হয়েছিল নক্ষত্রের ভেতরে চলতে থাকা নিউক্লয়ার ফিউশন১ বা পারমাণবিক সংযোজন প্রক্রিয়ায়। আবার কোনোটা তৈরি হয়েছিল বিশাল নক্ষত্রের ভয়ংকর মৃত্যুকালের সুপারনোভা বিস্ফোরণে।
এই স্থিতিশীল পরমাণুগুলোর নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকে প্রোটন ও নিউট্রন। এদের একসঙ্গে শক্ত করে ধরে রাখে গ্লুয়ন নামের মৌলিক কণা। গ্লুয়নই শক্তিশালী নিউক্লয়ার বলের বাহক। ফলে পরমাণুর নিউক্লিয়াসগুলো আঠা দিয়ে জোড়া লাগার মতো খুব শক্ত করে বাঁধা থাকে। তাই পরমাণুগুলো ভেঙে অন্য কোনো মৌলে রূপান্তরিত হতে চায় না। এ কারণে এসব পরমাণু অবিশ্বাস্য রকম দীর্ঘস্থায়ী।

অন্যদিকে, পৃথিবীতে অল্প কিছু তেজস্ক্রিয় পরমাণু রয়েছে। এগুলো শক্তির দিক থেকে অস্থিতিশীল। এদের মধ্যে প্রোটন ও নিউট্রনের সংখ্যা ভারসাম্যহীন থাকে। ফলে নিউক্লিয়াসকে একসঙ্গে ধরে রাখা শক্তিশালী নিউক্লয়ার বলও এতে ব্যাহত হয়। তাই নিজেদের বর্তমান অবস্থায় পরমাণুগুলো মোটেও স্বস্তিতে থাকে না। তার চেয়ে তারা উপপারমাণবিক কণা কিংবা শক্তি নিঃসরণ করতে করতে চায়, যাতে তাদের প্রোটন ও নিউট্রনগুলো আরও শক্তভাবে জোড়া বেঁধে একটি সুস্থিত কাঠামো লাভ করতে পারে।
গ্লুয়নই শক্তিশালী নিউক্লয়ার বলের বাহক। ফলে পরমাণুর নিউক্লিয়াসগুলো আঠা দিয়ে জোড়া লাগার মতো খুব শক্ত করে বাঁধা থাকে। তাই পরমাণুগুলো ভেঙে অন্য কোনো মৌলে রূপান্তরিত হতে চায় না।
অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াস আরও স্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য তিন ধরনের তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। সেগুলো হলো আলফা ক্ষয়, বিটা ক্ষয় এবং গামা ক্ষয়। আলফা ক্ষয়ের ক্ষেত্রে একটি তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস একটি আলফা কণা নিঃসৃত হয়। আলফা কণা আসলে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস। এতে থাকে দুটি প্রোটন ও দুটি নিউট্রন। এই কণা বেরিয়ে যাওয়ার পর নিউক্লিয়াসটি আরও স্থিতিশীল অবস্থায় আসে। আলফা ক্ষয়ের সময় পরমাণুর নিউক্লিয়াস দুটি প্রোটন হারায়। ফলে ভর হারিয়ে অন্য একটি মৌলে পরিণত হয় পরমাণুটি। তাই পর্যায় সারণিতে এটি বাঁদিকে দুই ঘর পিছিয়ে গিয়ে কম ভরের একটি নতুন মৌলে পরিণত হয়।

আলফা কণার ভর তুলনামূলকভাবে বেশি—প্রায় ৪ u। এখানে u হলো পারমাণবিক ভরের একক। একটি কার্বন-১২ পরমাণুর ভরের ১/১২ অংশকে বলা হয় ১ u। অর্থাৎ এর ভর মোটামুটি একটি প্রোটন বা নিউট্রনের ভরের সমান। আলফা কণার আধানও তুলনামূলকভাবে বেশি—+২e। এখানে e হলো ইলেকট্রনের চার্জের মান। এ ছাড়া আলফা কণা বেশ ধীর গতিতে নিঃসৃত হয়। এর গতি আলোর গতির মাত্র ৫ শতাংশের মতো। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে আলফা কণা অন্য পরমাণুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে বেশ জোরালোভাবে। তাই এই কণা খুব বেশি দূর পর্যন্ত ভেদ করে যেতে পারে না। বাতাসের মধ্যেই মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার যাওয়ার পর হিলিয়াম নিউক্লিয়াসগুলো থেমে যায়।
আলফা কণার আধানও তুলনামূলকভাবে বেশি—+২e। এখানে e হলো ইলেকট্রনের চার্জের মান। এ ছাড়া আলফা কণা বেশ ধীর গতিতে নিঃসৃত হয়। এর গতি আলোর গতির মাত্র ৫ শতাংশের মতো।
জেনে হয়তো স্বস্তি পাবে যে, আলফা ক্ষয় হতে থাকা কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থে দুর্ঘটনাবশত হাত লেগে গেলেও তুমি সম্পূর্ণ সুস্থভাবে দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে যেতে পারবেন। কারণ, তোমার শরীরকে আবৃত করে রাখা মরা চামড়ার পাতলা স্তরটি এই আলফা কণাগুলোকে আটকে দেবে। এই মৃতকোষগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের শরীর থেকে ঝরে পড়ে। তবে আলফা বিকিরণের উৎস যদি কোনোভাবে পেটের ভেতর চলে যায়, তাহলে তা শরীরের ভেতরের কোষগুলোর মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। কারণ এরা পরমাণু থেকে ইলেকট্রন টেনে বের করে দিয়ে সেগুলোকে আয়নিত করে। তাতে দেহকোষের ডিএনএ’র শিকল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।

স্বল্পপাল্লার এই ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করেই রাশিয়ার দলত্যাগী গোয়েন্দা কর্মকর্তা অ্যালেক্সান্ডার লিটভিনেঙ্কোকে হত্যা করা হয়েছিল। লিটভিনেঙ্কোর অপরাধ তিনি রাশিয়া ছেড়ে যুক্তরাজ্যে চলে গিয়েছিলেন। ২০০৬ সালে তাঁর অজান্তে চায়ে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল পোলোনিয়াম-২১০ নামের একটি তেজস্ক্রিয় মৌলের প্রাণঘাতী মাত্রা। এই পদার্থটি তৈরি হয়েছিল রাশিয়ার একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে। এই বিষাক্ত পদার্থ তাঁর শরীরে ঢোকা মাত্রই বিপুল পরিমাণ আয়ন সৃষ্টিকারী আলফা কণা নিঃসৃত হতে থাকে। ফলে দ্রুত গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর বমি ও রক্তবমি শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত মাত্র ২২ দিন পর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান লিটভিনেঙ্কো।
২০০৬ সালে লিটভিনেঙ্কোর অজান্তে চায়ে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল পোলোনিয়াম-২১০ নামের তেজস্ক্রিয় মৌলের প্রাণঘাতী মাত্রা। এই পদার্থটি তৈরি হয়েছিল রাশিয়ার একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে।
স্থিতিশীল হওয়ার পথে তেজস্ক্রিয় পরমাণু বিটা ক্ষয়ের মধ্য দিয়েও যেতে পারে। বিটা ক্ষয় আবার দুই ধরনের—বিটা-মাইনাস এবং বিটা-প্লাস। বিটা-মাইনাস ক্ষয়ের সময় তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসের একটি নিউট্রন রূপান্তরিত হয়ে প্রোটনে পরিণত হয়। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, যেন নিজের রংয়ে বিরক্ত হয়ে কোনো গিরগিটি রং বদলে ফেলল! এই পরিবর্তনের সময় একটি উচ্চগতির ইলেকট্রন এবং একটি ইলেকট্রন অ্যান্টিনিউট্রিনো বেরিয়ে আসে। ফলে নিউক্লিয়াসের প্রোটনের সংখ্যা এক বেড়ে যায়। তাই মৌলটিও বদলে যায়। তবে এর ভর প্রায় একই থাকে। কারণ প্রোটন ও নিউট্রনের ভর প্রায় সমান।
অন্যদিকে, বিটা-প্লাস ক্ষয়ে ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে একটি প্রোটন রূপান্তরিত হয়ে নিউট্রনে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ায় একটি উচ্চগতির পজিট্রন এবং একটি ইলেকট্রন নিউট্রিনো বেরিয়ে আসে। পজিট্রন হলো ইলেকট্রনের প্রতিকণা। এবার তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসের প্রোটনের সংখ্যা এক কমে যায়। ফলে মৌলটিও বদলে যায়। কিন্তু আগের মতোই এর ভর প্রায় অপরিবর্তিত থাকে।
বিটা কণা—অর্থাৎ ইলেকট্রন বা পজিট্রন—আলফা কণার চেয়ে অনেক হালকা। এর আধানও কম। ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে তা -১e, আর পজিট্রনের ক্ষেত্রে +১e। আর এর ভর একটি নিউক্লিয়নের তুলনায় প্রায় ২,০০০ ভাগ কম। সবচেয়ে বড় কথা, তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস থেকে বের হওয়ার সময় বিটা কণা প্রায় আলোর গতিতে ছুটে যায়। এই কারণে আশপাশের পরমাণুর সঙ্গে বিটা কণার মিথস্ক্রিয়া আলফা কণার তুলনায় অনেক দুর্বল। তাই বিটা কণা আলফা কণার চেয়ে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। একে থামাতে সাধারণত একটি ধাতব পাতের প্রয়োজন হয়। বিটা কণা মানুষের ত্বকের বাইরের স্তরও ভেদ করে ভেতরে ঢুকতে পারে। ফলে বিটা বিকিরণ ছড়ায় এমন কোনো উৎসের সংস্পর্শে এলে ত্বকে যন্ত্রণাদায়ক পোড়াক্ষত তৈরি হতে পারে।
বিটা-মাইনাস ক্ষয়ের সময় তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসের একটি নিউট্রন রূপান্তরিত হয়ে প্রোটনে পরিণত হয়। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, যেন নিজের রংয়ে বিরক্ত হয়ে কোনো গিরগিটি রং বদলে ফেলল!
তবে আলফা কণার তুলনায় বিটা কণার আয়ন তৈরির ক্ষমতা কম। তাই দুর্ঘটনাবশত তেজস্ক্রিয় কোনো পদার্থ বিটা ক্ষয়ের মধ্য দিয়ে গেলে এবং তা শরীরের ভেতরে ঢুকে পড়লে, আলফা কণা নির্গত করে এমন উৎসের তুলনায় সেটি সাধারণত কম বিষাক্ত। তবু বিটা কণা শরীরের কোষ ও অঙ্গের জন্য ক্ষতিকর। তাই বিটা বিকিরণের কোনো উৎসকে মুখরোচক খাবার মনে করে খেয়ে ফেলার ভুল করো না!
বিটা কণার ক্ষতিকর দিকটি ভয়াবহভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে। সে সময় ছয়জন ক্যানসার রোগী বিটা বিকিরণের মারাত্মক মাত্রার অতিরিক্ত ডোজের শিকার হন। এর কারণ ছিল থেরাক-২৫ নামের কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত রেডিয়েশন থেরাপি মেশিনের সফটওয়্যারের কিছু ত্রুটি। বিকল হয়ে যাওয়া ওই মেশিনগুলো থেকে ধারণার চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি মাত্রার উচ্চ-শক্তির ইলেকট্রন বিম (বিটা কণা) নিঃসৃত হয়েছিল। সেটাই ওই রোগীদের জন্য গুরুতর আঘাত, এমনকি মৃত্যুর কারণ হয়েছিল।

বিকিরণের তৃতীয় এবং শেষ ধরন হলো গামা ক্ষয়। এতে উচ্চ শক্তিসম্পন্ন একটি নিউক্লিয়াস তার কম শক্তির গ্রাউন্ড স্টেটে ফিরে আসে। এই সময় সেটি একটি গামা রশ্মি নিঃসৃত করে। গামা রশ্মি হলো খুবই উচ্চশক্তির একটি ফোটন। এর কম্পাঙ্ক এক্স-রশ্মির চেয়েও বেশি। গামা রশ্মি বেরিয়ে যাওয়ার সময় নিউক্লিয়াসের ভর বা চার্জের কোনো পরিবর্তন হয় না। তাই নিউক্লিয়াসটি যে মৌলের, সেটিও বদলায় না। গামা রশ্মির কোনো চার্জ বা ভর নেই। তাই পদার্থের সঙ্গে এর মিথস্ক্রিয়াও খুব দুর্বল। সাধারণত সামনে যা-ই পড়ে, গামা রশ্মি তার ভেতর দিয়েই সোজা চলে যেতে পারে।
গামা রশ্মি হলো খুবই উচ্চশক্তির একটি ফোটন। এর কম্পাঙ্ক এক্স-রশ্মির চেয়েও বেশি। গামা রশ্মি বেরিয়ে যাওয়ার সময় নিউক্লিয়াসের ভর বা চার্জের কোনো পরিবর্তন হয় না।
এর শক্তি এত বেশি যে এটি পরমাণু বা অণু থেকে ইলেকট্রন ছিনিয়ে নিয়ে সেগুলোকে আয়নিত করতে পারে। ছিটকে বেরিয়ে যাওয়া সেই ইলেকট্রনগুলো আপেক্ষিক গতিতে ছুটতে থাকে এবং বিটা কণায় পরিণত হয়। এরপর তারা আরও আয়ন সৃষ্টি করতে থাকে। তাই বেশির ভাগ গামা রশ্মি মানুষের শরীরের ভেতর দিয়ে সোজা বেরিয়ে গেলেও, কিছু গামা রশ্মি শরীরের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে গামা বিকিরণের উৎসকে নিরাপদে আটকে রাখতে মোটা সিসা ও কংক্রিটের স্তর দিয়ে যথেষ্ট সুরক্ষা তৈরি করতে হয়।

১৯৮৬ সালে চেরনোবিল২ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়ার ফিশন৩ বা পারমাণবিক বিভাজন চুল্লি বিস্ফোরিত হয়েছিল। ফলে চুল্লির ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও পরবর্তী তেজস্ক্রিয় ছাই ও বর্জ্য পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তেজস্ক্রিয়তায় দূষিত হয়ে যায়। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই বিপর্যয় সামাল দিতে পারমাণবিক বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ এবং দূষিত এলাকা পরিষ্কারের কাজে খরচ হয়েছিল আনুমানিক ৭০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দুর্ঘটনার পরপরই তেজস্ক্রিয় অবশিষ্টাংশ থেকে বেরিয়ে আসা দূরপাল্লার গামা বিকিরণ আটকে রাখতে তড়িঘড়ি করে ইস্পাত ও কংক্রিটের তৈরি একটি বিশাল আবরণ নির্মাণ করা হয়েছিল।
১৯৮৬ সালে চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়ার ফিশন বা পারমাণবিক বিভাজন চুল্লি বিস্ফোরিত হয়েছিল।
তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কথা বলব, অথচ তার এর মূল কাণ্ডারী কথা বলব না—তা কি হয়? তিনি ছিলেন পোলিশ-ফরাসি পদার্থবিদ এবং দুইবার নোবেল পুরস্কারজয়ী মেরি স্ক্লোদোভস্কা-কুরি। গবেষণার সময় তিনি লক্ষ করেছিলেন, কিছু মৌল থেকে এক ধরনের রহস্যময় বিকিরণ নিঃসৃত হয়। সেই বিকিরণ বাতাসের অণুকে আয়নিত করতে পারে। এই পর্যবেক্ষণের পর তিনি তেজস্ক্রিয় মৌল রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম আবিষ্কার করেন। সেগুলো আলাদা করে শনাক্ত করতেও সক্ষম হন। তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে তাঁর এই গবেষণার সময়ে মানুষের শরীরে বিকিরণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে কারও জানা ছিল না। তাই স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কোনো বালাইও সেখানে ছিল না।
মেরি কুরি তাঁর ল্যাবরেটরির পোশাকের পকেটে তেজস্ক্রিয় পদার্থভর্তি টেস্টটিউব রেখে ঘুরে বেড়াতেন। এমনকি অন্ধকারে তেজস্ক্রিয় পদার্থের জ্বলজ্বলে আলো দেখতেও তিনি আনন্দ পেতেন!

পারমাণবিক বিজ্ঞানে তাঁর অসাধারণ অবদানের জন্য তাঁকে শেষ পর্যন্ত চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। দীর্ঘদিন বিকিরণের সংস্পর্শে থাকার ফলে তাঁর অস্থিমজ্জা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ক্ষতির কারণেই শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান।
তেজস্ক্রিয় বিকিরণ সম্পর্কিত সতর্কবার্তা দেওয়ার পর, এবার দেখার পালা, পুরো ব্যাপারটায় কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের জায়গাটা কোথায়। নিউক্লিয়াস এবং তার ভেতরে থাকা প্রোটন ও নিউট্রন এতই ক্ষুদ্র যে এরা সবাই কোয়ান্টাম কণা। ফলে তারা ধ্রুপদি পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো তোয়াক্কা করে না। তা যদি না হতো, তাহলে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের তিনটি রূপের একটি রূপ কখনোই সম্ভব হতো না।
মেরি কুরি তাঁর ল্যাবরেটরির পোশাকের পকেটে তেজস্ক্রিয় পদার্থভর্তি টেস্টটিউব রেখে ঘুরে বেড়াতেন। এমনকি অন্ধকারে তেজস্ক্রিয় পদার্থের জ্বলজ্বলে আলো দেখতেও তিনি আনন্দ পেতেন!
এবার পরিচিত হওয়া যাক আলফা ক্ষয়ের সেই অদ্ভুত ঘটনার সঙ্গে। আলফা বিকিরণের সময় হিলিয়াম নিউক্লিয়াস বা আলফা কণা নিউক্লিয়াস ছেড়ে বেরিয়ে আসার জন্য একটি শক্তির বাধা পার হতে হয়। ঠিক যেমন একটি বলকে পাহাড় ডিঙিয়ে ওপাশে যেতে হয়। এই শক্তির বাধা তৈরি হয় বৈদ্যুতিক বিকর্ষণের কারণে। আলফা কণার চার্জ ধনাত্মক। নিউক্লিয়াসের চার্জও ধনাত্মক। তাই এই দুটো একে অপরকে বিকর্ষণ করে। এই বিকর্ষণকে ব্যাখ্যা করা যায় কুলম্বের সূত্র দিয়ে।

১৭৮৫ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী শার্ল-অগুস্তাঁ দ্য কুলম্ব এই সূত্র প্রকাশ করেন। এর সাহায্যে আধানযুক্ত দুটি বস্তুর মধ্যে কতটা বল কাজ করছে, তা হিসাব করা যায়। আলফা কণা যতক্ষণ নিউক্লিয়াসের ভেতরে সুখে-শান্তিতে আবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ তাকে সেখানে আটকে রাখে স্বল্পপাল্লার শক্তিশালী নিউক্লিয়ার বল। এই বল এতই শক্তিশালী যে তা কুলম্বের বৈদ্যুতিক বিকর্ষণকে হার মানিয়ে দেয়।
এই শক্তিশালী বলটিই গ্লুয়নের সাহায্যে প্রোটন ও নিউট্রনের ভেতরের তিনটি কোয়ার্ককে আঠার মতো আটকে রাখে। কিন্তু এই বলের প্রভাব বিস্তারেরও একটি সীমা আছে। নিউক্লিয়াসের আকারের সমান অতি ক্ষুদ্র দূরত্বের মধ্যেই কেবল এটি শক্তিশালী থাকে।
তাই আলফা কণা যখন নিউক্লিয়াসের সীমানা ছাড়িয়ে একটু দূরে যায়, অমনি কুলম্বের বিকর্ষণ বলটি শক্তিশালী নিউক্লিয়ার বলকে হারিয়ে দেয়। সহজ করে বললে, শক্তির দিক থেকে আলফা কণাটি আর নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকতে চায় না।
১৭৮৫ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী শার্ল-অগুস্তাঁ দ্য কুলম্ব এই সূত্র প্রকাশ করেন। এর সাহায্যে আধানযুক্ত দুটি বস্তুর মধ্যে কতটা বল কাজ করছে, তা হিসাব করা যায়।
আলফা ক্ষয় নিয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে অন্যতম বড় রহস্য ছিল: আলফা কণার কাছে যদি সেই শক্তির বাধা টপকে যাওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিই না থাকে, তাহলে তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসের শক্ত বাঁধন থেকে সে বেরিয়ে আসে কীভাবে?
আমাদের প্রতিদিনের ধ্রুপদি জগতের অভিজ্ঞতা বলবে, আলফা বিকিরণ আসলে একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু আমরা যে ধ্রুপদি জগতে বাস করি, তার পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম উপপারমাণবিক কণার জগতে হুবহু খাটে না। আলফা কণা বরং কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে চলে। তাই তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসের ভেতরে চিরকাল আটকে থাকতেও সে রাজি নয়।
কোয়ান্টাম জগতে আলফা কণার তরঙ্গের মতো আচরণই তাকে অসাধারণ এক পালানোর ক্ষমতা দেয়। আলফা কণার তরঙ্গ-প্রকৃতি এমন যে তার তরঙ্গ-ফাংশনের একটি ক্ষীণ অংশ সব সময় নিউক্লিয়াসের সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে থাকে।

ফলে আলফা কণাটি কোনো বাহ্যিক ধাক্কা ছাড়াই হঠাৎ নিউক্লিয়াসের বাইরে পাওয়া যাওয়ার একটি নির্দিষ্ট সম্ভাবনা থাকে। এই অদ্ভুত ঘটনাকে বলা হয় কোয়ান্টাম টানেলিং। আর এই কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের কারণেই আলফা ক্ষয় সম্ভব হয়।
ধ্রুপদি পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে আলফা কণাকে শক্তির বাধার ওপর দিয়ে লাফিয়ে যেতে হয় না। তার বদলে সে যেন সেই বাধার ভেতর দিয়েই একটি সুড়ঙ্গ তৈরি করে বা টানেলিং করে বেরিয়ে যেতে পারে। নিউক্লিয়াসের ভেতরে আলফা কণার যে পরিমাণ শক্তি থাকে, তা তার কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের সম্ভাবনাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। এই সম্ভাবনাই ঠিক করে দেয় তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস কত দ্রুত ক্ষয় হবে। আর এটাই তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসের অর্ধায়ু বা হাফ লাইফ। কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থের অর্ধেক নিউক্লিয়াস ক্ষয় হতে যে সময় লাগে, সেটিই তার অর্ধায়ু।
ধ্রুপদি পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে আলফা কণাকে শক্তির বাধার ওপর দিয়ে লাফিয়ে যেতে হয় না। তার বদলে সে যেন সেই বাধার ভেতর দিয়েই একটি সুড়ঙ্গ তৈরি করে বা টানেলিং করে বেরিয়ে যেতে পারে।
আলফা ক্ষয়ের আসল কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছিল ১৯২৮ সালে। সোভিয়েত-মার্কিন পদার্থবিদ ও কসমোলজিস্ট জর্জ গ্যামো এবং ব্রিটিশ তাত্ত্বিক পদার্থবিদ রোনাল্ড উইলফ্রেড গার্নি ও মার্কিন পারমাণবিক পদার্থবিদ এডওয়ার্ড কন্ডন স্বাধীনভাবে এই ব্যাখ্যা দাঁড় করান। তাদের এই ব্যাখ্যা ছিল কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের একদম নতুন তত্ত্বটির এক দুর্দান্ত এবং অকাট্য প্রমাণ।
পৃথিবীর ভেতরের ভাগ তেজস্ক্রিয়তার কারণে উত্তপ্ত থাকে। তার প্রধান কারণ হলো এই আলফা ক্ষয়। পৃথিবীর জন্ম হয়েছিল প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে। তখন ধুলিকণা, পাথুরে গ্রহাণু আর পুরোপুরি তৈরি না হওয়া ছোট ছোট গ্রহের ভয়ংকর সংঘর্ষে পৃথিবী গড়ে উঠছিল। তখন থেকেই এই তেজস্ক্রিয়তা পৃথিবীর কেন্দ্রের শীতল হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিয়েছে।
পৃথিবীর ভেতরটা গরম রাখার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ হলো ইউরেনিয়াম-২৩৮ ও থোরিয়াম-২৩২। পৃথিবীর ভূত্বক ও ম্যান্টলে এদের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে, প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া অনেক তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসের তুলনায় এদের অর্ধায়ুও অনেক দীর্ঘ।


এই দুই কারণে পৃথিবীর ভেতরের তাপ ধরে রাখার ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই নিউক্লিয়াসগুলো আলফা কণা ছুড়ে দিয়ে একে একে তাদের নিজ নিজ তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াতেই আশপাশের পরিবেশে তাপ ছড়িয়ে পড়ে এবং তা উত্তপ্ত করে তোলে। কোয়ান্টাম টানেলিং যদি আলফা ক্ষয় সম্ভব না হতো, তাহলে আমাদের পৃথিবীর ভেতরের অংশ আজকের তুলনায় অনেক বেশি ঠান্ডা হয়ে যেত। তার ফলাফল হতো বিশাল। কারণ পৃথিবী তখন বসবাসের জন্য হয়ে উঠত আজকের পৃথিবীর চেয়ে একেবারেই আলাদা একটি জায়গা।
পৃথিবীর ভেতরটা গরম রাখার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ হলো ইউরেনিয়াম-২৩৮ ও থোরিয়াম-২৩২। পৃথিবীর ভূত্বক ও ম্যান্টলে এদের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি।
বিশালাকার পেঁয়াজের মতো পৃথিবীরও বেশ কয়েকটি স্তর রয়েছে। একদম বাইরের স্তরটি হলো পাতলা পাথুরে ভূত্বক। এর পুরুত্ব প্রায় ৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার। এই ভূত্বক আবার আলাদা আলাদা শক্ত টেকটোনিক প্লেটে৪ ভাগ হয়ে আছে। এই প্লেটগুলোর ওপরই মহাদেশ ও সমুদ্রের তলদেশ গড়ে উঠেছে। এর নিচে রয়েছে ম্যান্টল। এটি প্রায় ২,৯০০ কিলোমিটার পুরু একটি পাথুরে স্তর। বেশির ভাগ সময় এটি কঠিন অবস্থায় থাকে। তবে কোটি কোটি বছরের মতো দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময়ে তা তরলের মতো আচরণ করতে পারে।
আরও গভীরে রয়েছে তরল বহিঃকেন্দ্র বা বাইরের কোর। এর পুরুত্ব প্রায় ২,৩০০ কিলোমিটার। এটি মূলত লোহা ও নিকেল দিয়ে তৈরি। এই তরল স্তরটি ঘিরে রেখেছে পৃথিবীর অন্তঃকেন্দ্র বা ভেতরের কোরকে। সেটি লোহা ও নিকেলের তৈরি একটি কঠিন গোলক। এর ব্যাসার্ধ প্রায় ১,২২০ কিলোমিটার।

পৃথিবীর ভেতরের তাপই পৃথিবীর পৃষ্ঠকে বদলে দেওয়ার অন্যতম প্রধান শক্তি। এই তাপ টেকটোনিক প্লেটগুলোকে নড়াচড়া করায়। ম্যান্টলের ভেতরে তাপের কারণে সৃষ্ট পরিচলন স্রোত অনেকটা চলন্ত কনভেয়ার বেল্টের মতো কাজ করে। কোথাও মহাদেশগুলো একে অপরের দিকে ধাক্কা খায়। আবার কোথাও সমুদ্রের তলদেশ দুদিকে ছিঁড়ে সরে যায়।
গভীরে রয়েছে তরল বহিঃকেন্দ্র বা বাইরের কোর। এর পুরুত্ব প্রায় ২,৩০০ কিলোমিটার। এটি মূলত লোহা ও নিকেল দিয়ে তৈরি। এই তরল স্তরটি ঘিরে রেখেছে পৃথিবীর অন্তঃকেন্দ্র বা ভেতরের কোরকে।
টেকটোনিক প্লেটের এই নড়াচড়া প্রকৃতির অবিরাম ক্ষয়শক্তির সঙ্গে লড়াই করে পৃথিবীর দুর্গম ও উঁচুনিচু চেহারা তৈরি করে। প্লেটগুলো একে অপরের দিকে ধাক্কা দিলে বিশাল পর্বতমালা মাথা তুলে দাঁড়ায়। আবার প্লেটগুলো যখন পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়, তখন তৈরি হয় গভীর ফাটল ও বিশাল খাদ। মনে হয়, সেগুলোর তলদেশ যেন দেখা যায় না। অন্যদিকে বাতাস, বৃষ্টি আর বরফ প্রতিনিয়ত পৃথিবীর এই উঁচুনিচু গঠনগুলোকে ক্ষয় করে মসৃণ করে চলেছে। কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের মাধ্যমে আলফা ক্ষয় সম্ভব না হলে পৃথিবীর পর্বতগুলো সম্ভবত আজকের তুলনায় অনেক বেশি চ্যাপ্টা বা সমতল হয়ে যেত!
পৃথিবীর ভেতরের তাপ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। এটি লোহা ও নিকেল দিয়ে তৈরি কোরের তরল বাইরের স্তরটি গলিত অবস্থায় ধরে রাখে। এই তরল বাইরের কোরের ভেতরে আধানযুক্ত কণাগুলো পরিচলন স্রোতের মতো চলাচল করে। এর ফলে তৈরি হয় বিশাল বৈদ্যুতিক প্রবাহ। এই বৈদ্যুতিক প্রবাহই পৃথিবীর চুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরির জন্য দায়ী। ব্যাপারটা অনেকটা বিশাল একটি সোলেনয়েডের মতো। অনেকে হয়তো জানো, সোলেনয়েড হলো এমন একটি তারের কয়েল বা কুণ্ডলী, যার মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে সেটি দণ্ডচুম্বকের মতো একটি চুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করে।

পৃথিবীর চুম্বকীয় ক্ষেত্র পৃথিবীর ভেতর থেকে অনেক দূর মহাশূন্য পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। সেখানে এর সামনে পড়ে ভয়ংকর এক সৌরঝড়—সৌরবায়ু। সৌরঝড় আসলে উচ্চশক্তির চার্জযুক্ত কণার একটি স্রোত। এর বেশির ভাগই ইলেকট্রন, প্রোটন ও আলফা কণা। সূর্যের ওপরের বায়ুমণ্ডল থেকে এই কণাগুলো বেরিয়ে আসে। পৃথিবীর চুম্বকীয় ক্ষেত্র এই সৌরবায়ুকে বাঁকিয়ে দেয়। ফলে চার্জযুক্ত কণাগুলো সরাসরি পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে না, বরং সেগুলো পৃথিবীর চারপাশ দিয়ে ঘুরে চলে যায়। এভাবেই পৃথিবীর চারপাশে তৈরি হয় একটি সুরক্ষাবলয় অঞ্চল। একে বলা হয় ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বা চুম্বকীয়মণ্ডল।
সৌরঝড় আসলে উচ্চশক্তির চার্জযুক্ত কণার একটি স্রোত। এর বেশির ভাগই ইলেকট্রন, প্রোটন ও আলফা কণা। সূর্যের ওপরের বায়ুমণ্ডল থেকে এই কণাগুলো বেরিয়ে আসে।
সৌরঝড় যখন এই ম্যাগনেটোস্ফিয়ারে আঘাত হানে, তখন মহাকাশ থেকে আসা চার্জযুক্ত কণাগুলো আমাদের বায়ুমণ্ডলকে আয়নিত করে। ফলে মেরুপ্রদেশের আকাশে দেখা যায় চমৎকার আলোর খেলা। একে বলা হয় মেরুজ্যোতি৫ বা অরোরা। পৃথিবীর কেন্দ্র যদি ঠান্ডা ও কঠিন হতো, তাহলে কখনোই এমন প্রতিরক্ষামূলক চুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করতে পারত না। ফলে মহাজাগতিক ক্ষতিকর রশ্মি থেকে পৃথিবীর কোনো প্রাণের সুরক্ষাও থাকত না। তখন মহাশূন্য থেকে ধেয়ে আসা আয়ন সৃষ্টিকারী ক্ষতিকর বিকিরণের কারণে অনেক বেড়ে যেত আমাদের ডিএনএতে পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটার ঝুঁকি। জীবনের স্থায়িত্বও পড়ত হুমকির মুখে।

আলফা বিকিরণের মাধ্যমে পৃথিবীকে উষ্ণ রাখার জন্য তাই আমরা কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের কাছে ঋণী। পৃথিবীর ভেতরের এই তাপের উৎসটি না থাকলে ম্যান্টলের ভেতরের পরিচলন স্রোত থেমে যেত। তাতে বন্ধ হয়ে যেত টেকটোনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়া। ধীরে ধীরে ক্ষয়ের ফলে আমাদের পর্বতগুলো হয়ে যেত চ্যাপ্টা। পৃথিবীর গভীর ফাটল ও গিরিখাতগুলো পলি পড়ে ভরাট হয়ে যেত।
সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, পৃথিবীর গলিত কেন্দ্রভাগ জমে শক্ত হয়ে যেত শত কোটি বছর আগেই। তখন পৃথিবীর কেন্দ্র হতো এক হিমশীতল হৃদয়ের মতো। আর পৃথিবীর সুরক্ষাকারী চুম্বকীয় ক্ষেত্র না থাকলে মহাজাগতিক রশ্মি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার ব্যবস্থাও থাকত না। সে ক্ষেত্রে পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের পথ সম্ভবত সম্পূর্ণ অন্য রকম হতো।
আলফা বিকিরণের মাধ্যমে পৃথিবীকে উষ্ণ রাখার জন্য তাই আমরা কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের কাছে ঋণী। পৃথিবীর ভেতরের এই তাপের উৎসটি না থাকলে ম্যান্টলের ভেতরের পরিচলন স্রোত থেমে যেত।
এমনকি আমাদের গ্রহে আদৌ প্রাণের সূচনা হতে পারত কি না, সেটিও প্রশ্ন। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোয়ান্টাম কণা এমন একটি অসম্ভব শক্তির বাধা পার হয়ে সুড়ঙ্গ কাটার মতো করে চলে যাচ্ছে, যা ধ্রুপদি পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে পার হওয়া অসম্ভব। আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ এই ঘটনাই শেষ পর্যন্ত আমাদের জীবনে বদলে দিতে পারে সবকিছু, তা সত্যিই ভাবা যায় না!
