কিছু মানুষের জীবন থাকে ফাইলের মতো- সাজানো, গোছানো, তারিখ দিয়ে মার্ক করা। আর কিছু জীবন থাকে কবিতার খাতার মতো—খোলা, এলোমেলো, মাঝে মাঝে ছেঁড়া পাতা, কিন্তু প্রতিটা পাতায় একটা করে দাগ, যেটা আর কোথাও পাওয়া যায় না। রথো রাফির জীবনটা ছিল সেই দ্বিতীয় দলে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে তিনি চলে গেলেন। চলে যাওয়ার সময় তিনি ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের আইসিইউতে। যারা তাকে চিনত, তারা জানে—রথো রাফি কখনো ভিড়ের মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন ভিড় থেকে একটু সরে দাঁড়ানো মানুষ। যেমনটা রাখাল মাঠে ছাগল-বকরি ছেড়ে দিয়ে একা একা গাছের ছায়ায় বসে বাঁশি বাজাত।
নব্বইয়ের ছোটকাগজের গন্ধ শুঁকে যারা বড় হয়েছে, তারা জানে রথো রাফি মানে কী। রথো রাফি মানে বইমেলায় স্টলে বই না থাকা, কিন্তু মেলার মাঠে ঠিকই তাঁর পাঠক থাকা। রথো রাফি মানে ফেসবুকে লাইক-কমেন্টের হিসাব না কষে, বছরের পর বছর একটা লাইনের জন্য অপেক্ষা করা।
জন্ম ১৯৭৫-এ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে। রসায়নে পড়েছিলেন। রসায়নের ছাত্র, অথচ তার জীবনের সব বিক্রিয়াটা ঘটেছে কবিতায়। এটা খুব ইন্টারেস্টিং—একজন মানুষ, যিনি ল্যাবরেটরির ফর্মুলা জানেন, তিনি শেষ পর্যন্ত বেছে নিলেন ভাষার ফর্মুলা। কারণ কবিতাও তো এক ধরনের রসায়ন। শব্দের সঙ্গে শব্দের বিক্রিয়া।
পেশায় তিনি ছিলেন সাংবাদিক। সমকাল, ভোরের কাগজ। নিউজরুমের ডেডলাইনের ভেতরেও তিনি কবিতার ডেডলাইন বাঁচিয়ে রাখতেন। কিন্তু সাংবাদিকতাটা তার আসল পরিচয় ছিল না। আসল পরিচয় ছিল—তিনি কবি। এবং এই শহরে, এই সময়ে, কবি পরিচয়ে বেঁচে থাকাটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, রথো রাফির কোনো তাড়া ছিল না। কোনো বই প্রকাশের তাড়া, কোনো পুরস্কারের তাড়া, কোনো কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার তাড়া। ১৯৯৯ থেকে ২০১৯—বিশ বছর ধরে কবিতা লিখেছেন, কিন্তু বই করেছেন মাত্র একটা। ‘অক্ষর ও বালির পৃথিবী’। ২০২০ সালে প্রকাশিত, ৪৩২ পৃষ্ঠা, দুই শতাধিক কবিতা। এই একটা তথ্যই তার কবিজীবনের পুরো দর্শনটা বলে দেয়। তিনি লিখেছেন নিজের জন্য, জমিয়েছেন নিজের জন্য। প্রকাশককে খুশি করার জন্যও নয়, আবার পাঠককে ইমপ্রেস করার জন্যও নয়।
এই শহরে সবাই কিছু না কিছু হতে চায়, শুধু কেউ মানুষ হতে চায় না। রথো রাফি হতে চেয়েছিলেন কবি। শুধু কবি। কোনো বিশেষণ ছাড়া কবি। কোনো কবি-সাংবাদিক, কবি-সংগঠক, কবি-মিডিয়া ব্যক্তিত্ব না। জাস্ট কবি। আর এই জাস্ট কবি হয়ে থাকাটাই এখন সবচেয়ে কঠিন।
তার কবিতা ছিল নিরাভরণ। এই শব্দটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিরাভরণ মানে কী? মানে অলংকার নেই, কিন্তু সৌন্দর্য আছে। আমাদের অনেক কবিতায় এখন অলংকার বেশি, কবিতা কম। রথো রাফি উল্টোটা করতেন। তিনি একটা লাইন লিখতেন, মনে হতো লাইনটা যেন অনেকক্ষণ ধরে বৃষ্টিতে ভিজেছে, তারপর রোদে শুকিয়েছে। কোনো বাড়তি শব্দ নেই।
যেমন তার অনুবাদ। অনুবাদ তো শুধু ভাষা বদলানো না, অনুবাদ হলো একটা আত্মাকে আরেকটা শরীরে নিয়ে আসা। তিনি অনুবাদ করেছেন এরিখ ফ্রাইডকে, বুকোস্কিকে, মুহাম্মদ আল-মাগুতকে, ইয়ারোস্লাভ সাইফার্টকে, লুইস গ্লুককে। আপনি লিস্টটা খেয়াল করুন। এঁরা কেউ বাজারের কবি না। এরা সবাই প্রান্তের কবি, যন্ত্রণার কবি, একাকিত্বের কবি। রথো রাফি তাদেরই বেছে নিয়েছিলেন। কারণ তিনি নিজেও ছিলেন সেই গোত্রের।
আমার মনে হয়, রথো রাফিরা এই কারণেই ছোটকাগজ আন্দোলনের মানুষ ছিলেন। ছোটকাগজ মানে কী? ছোটকাগজ মানে প্রতিষ্ঠানের বাইরে একটা জানালা। যেখানে সম্পাদক বলে না, এই কবিতাটা একটু সহজ করুন, পাঠক বুঝবে না। ছোটকাগজ বলে, কবিতা কঠিনই হবে, পাঠককেই একটু কষ্ট করতে হবে। রথো রাফি সেই কষ্টের পক্ষে ছিলেন।
এখন একটা প্রশ্ন আসে—একজন কবি যখন মারা যান, তখন আসলে কী মারা যায়? একজন মানুষ মারা যায়, এটা সত্য। কিন্তু একজন কবির মৃত্যুতে আরেকটা জিনিস মারা যায়—একটা ভাষা মারা যায়। রথো রাফি যে ভাষায় কথা বলতেন, যে ভাষায় অনুবাদ করতেন, যে ভাষায় চুপ করে থাকতেন, সেই ভাষাটা আর কেউ ওইভাবে বলবে না। বাংলা কবিতা একজন অনুবাদক হারাল মানে, বাংলা ভাষা বিশ্বের সঙ্গে কথা বলার একটা জানালা হারাল।
তার শেষ কয়েক বছর ছিল অসুস্থতায় ভরা। ফুসফুস, কিডনি, হৃদরোগ। শরীরটা ধীরে ধীরে ছেড়ে দিচ্ছিল। কিন্তু যারা তার কাছের মানুষ, তারা জানেন—তিনি কখনো শরীর নিয়ে অভিযোগ করেননি। কারণ কবিরা শরীর নিয়ে বাঁচে না, কবিরা বাঁচে ভাষা নিয়ে। শরীর খারাপ হলে ডাক্তারের কাছে যায়, কিন্তু ভাষা খারাপ হলে কোথায় যাবে?
সত্যিকারের কবিজীবন মানে ফেসবুকে কবি লেখা না, বায়োতে কবি লেখা না। সত্যিকারের কবিজীবন মানে—না লিখেও কবি হয়ে থাকা। বছরের পর বছর চুপ করে থেকে, একটা বই বের করে, আবার চুপ হয়ে যাওয়া। এই চুপ করে থাকাটাও একটা কবিতা।
এই শহরে এখন সবাই সবকিছু হতে চায় খুব দ্রুত। দ্রুত ভাইরাল, দ্রুত পরিচিত, দ্রুত প্রকাশিত। রথো রাফি ছিলেন দ্রুততার বিপরীত মানুষ। তিনি ধীর ছিলেন। ধীরে লিখতেন, ধীরে ভাবতেন, ধীরে বাঁচতেন। আর এই ধীর মানুষগুলোই আসলে সময়কে মনে রাখে। দ্রুত মানুষদের সময় ভুলে যায়।
একটা সত্যিকারের কবিজীবন কাটিয়ে বিদায় নিলেন কবি রথো রাফি। এই বাংলাদেশে, সত্যিকারের কবিজীবন কাটিয়ে বিদায় নিতে পারাটাই সবচেয়ে বড় সংগ্রাম, আবার সবচেয়ে বড় সার্থকতাও।
