এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা এবং এলপিজির দাম প্রতি সিলিন্ডার ২৫২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি জ্বালানির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিইআরসির কোন ধরনের শুনানি হয় নি । ফলে ভোক্তার ওপর দাম চাপিয়ে দেয়ার অতীত প্রবণতা আবার শুরু হয়েছে।
- সরকারের নির্বাহী আদেশে ইচ্ছেমতো বাড়ানো হচ্ছে তেল ও গ্যাসের দাম
এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা এবং এলপিজির দাম প্রতি সিলিন্ডার ২৫২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি জ্বালানির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিইআরসির কোন ধরনের শুনানি হয় নি । ফলে ভোক্তার ওপর দাম চাপিয়ে দেয়ার অতীত প্রবণতা আবার শুরু হয়েছে। খোদ সংসদীয় কমিটির বৈঠকে শুনানি ছাড়া জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর কেন সংকট থাকে না আগে কেন সংকট তৈরী হয় এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইনে সংশোধনী এনে বিইআরসির হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু জ্বালানি তেলের বিষয়টি বিগত সরকারের মতো হাতেই রেখে দিয়েছে। সম্প্রতি দুই দফায় ডিজেলে লিটার প্রতি ৩৫ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অনেক সমালোচনা চলছে। নির্বাহী আদেশে দাম ঘোষণা নিয়ে অনেকদিন ধরেই স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠছে। বিষয়টি নির্বাহী আদেশে না হয়ে বিইআরসির মাধ্যমে হলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। আবার সরকারের দায়ও থাকে না, তবুও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বিষয়টিকে কুক্ষিগত করে রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়,সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রশ্নবিদ্ধ হাওয়ার পর ফের আলোচনায় বিইআরসির জ্বালানি তেলের প্রবিধানমালা। ২০১২ সাল থেকে এভাবে অনেক দফায় আলোচনায় এসেছে, কিন্তু প্রত্যেকবারেই হেরে গেছে আমলাতান্ত্রিক দৌরাত্ম্যের কাছে। আর সেই ফাঁকগলে নির্বাহী আদেশে দেওয়া হচ্ছে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেনের দাম। গত ১ অক্টোবর গণশুনানি ছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণ জানতে চাওয়া হয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে ।
বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, ২০০৩ সালের বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইনের ৩৪ ধারায় বলা আছে, কমিশন শুনানির মাধ্যমে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করবে। এ জন্য তারা একটি প্রবিধান তৈরি করবে। গত ২৩ বছরে কেন এ প্রবিধান তৈরি করা হলো না-তা বৈঠকে জানতে চাওয়া হয়। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।
একদিন পরেই রোববার প্রবিধানমালা নিয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ তোড়জোড় দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে বিইআরসিতেও যোগাযোগ করা হয়। সর্বশেষ অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রবিধানমালা নিয়ে কাজ দেখা যায়। তখন মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মতামত চাওয়ার পর হারিয়ে যায় সবকিছু।
২০০৩ সালে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন পাশের মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও আধাবিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিইআরসি গঠন করা হয়। বিইআরসি মূলত ২০০৯ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। এ পর্যন্ত ১৩টি প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। আরও ১২টি প্রবিধানমালা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে রেখেছে মন্ত্রণালয়।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছেন, আমি যোগদানের আগে থেকেই প্রবিধানমালা মন্ত্রণালয়ে জমা রয়েছে। আমি যোগদানের পর এগুলো অনুমোদনের বিষয়ে জোর দিচ্ছি। তবে জ্বালানি তেলের পৃথক তিনটি প্রবিধানমালা (বিতরণ, সঞ্চালন ও খুচরা বিক্রয়) না করে একত্রে করার বিষয়টি সামনে এসেছে। আমরা ৩টি একত্রে করে পাঠিয়ে দিয়েছি।
আইনে সকল ধরনের জ্বালানির দাম নির্ধারণের এখতিয়ার দেওয়া হলেও প্রবিধানমালা ঝুলে থাকায় শুধুমাত্র গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করে আসছিল বিইআরসি। ২০২৩ সালে হঠাৎ করেই আইন সংশোধন করে নির্বাহী আদেশে দাম সমন্বয় (কম/বেশি) করার বিধান যুক্ত করা হয়। তারপর থেকে নির্বাহী আদেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করায় কার্যত বেকার হয়ে পড়ে রেগুলেটরি কমিশন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিপিসি নিজে তেল আমদানি করে, আবার কোম্পানি ও ডিলারের মাধ্যমে বিপণন করে। তারাই যদি দাম নির্ধারণ করে তাহলে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব না। দ্বৈতস্বত্তা হিসাবে আর্বিভূত হয়েছে বিপিসি। হয় তারা রেগুলেট করবে না হলে তারা বিপণন করবে। এখন যা হচ্ছে সম্পর্ণ আইনের পরিপন্থী।
আইনে বলা হয়েছে, সকল ধরনের এনার্জির মূল্য নির্ধারণ করবে বিইআরসি। ৩৪(৩) ধারায় বলা হয়েছে বিইআরসি প্রবিধানমালা প্রণয়ন করবে। তবে শর্ত থাকে যে, প্রবিধানমালা প্রণয়ন না করা পর্যন্ত সরকার প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারণ করতে পারবে। তবে প্রবিধানমালা না থাকলে মন্ত্রণালয়ে চিঠির প্রেক্ষিতে জেট ফুয়েল এবং ফার্নেস অয়েলের দাম এবং ক্যাবের রিটের প্রেক্ষিতে দেওয়া হাইকোর্টের আদেশের পর থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে বিইআরসি।
ক্যাবের জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম জানান , আমরা বিইআরসিকে ভবিষ্যতে শক্তিশালী ও কার্যকর দেখতে চাই। এখন পর্যন্ত বিইআরসি ইস্যুতে সরকারের অবস্থান আমাদের কাছে খুব একটা পরিষ্কার নয়। আগের সরকারের পথ ধরেই তারাও জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করছে। আগের সরকারের সুরেই কথা বলছে।
বিইআরসির একজন সাবেক সদস্য বলেছেন, ভারতসহ অনেক দেশে কোন চুক্তি করতে হলে রেগুলেটরি কমিশনের অনুমোদন নিতে হয়। আমাদের দেশেও যদি করা যায়, তাহলে তারা (বিইআরসি) দেখবে সেটির (প্রকল্প) আদৌ প্রয়োজন কি-না, আবার দর যৌক্তিক কি-না? দেশীয় স্বার্থ থাকলে তারা অনুমোদন দেবে। এতে ম্যাক্রো লেভেলে হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।
সংসদীয় কমিরি বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২ লাখ ৮৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নাজিবুর রহমান বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে হাইকোর্টে একটি মামলার রায় হয়েছে। পরে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। সে কিমিটির সুপারিশ কী ছিল, সুপারিশ কতুকু বাস্তবায়ন হয়েছে— এ বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকে জানাতে বলা হয়েছে।
নাজিবুর রহমান বলেন, ২০০৩ সালের বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইনের ৩৪ ধারায় বলা আছে, কমিশন শুনানির মাধ্যমে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করবে। এ জন্য তারা একটি প্রবিধান তৈরি করবে। গত ২৩ বছরে কেন এ প্রবিধান তৈরি করা হলো না—তা তারা বৈঠকে জানতে চেয়েছেন। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। তারা জানতে চেয়েছেন, সম্প্রতি এলপিজির দাম বাড়ানো, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে গণশুনানি করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অগ্রগতি কতুকু, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট তথ্য বৈঠকে দিতে পারেনি।
কমিটির আরেক সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ডিজেল হচ্ছে কৌশলগত জ্বালানি। ডিজেলের মজুত আছে মাত্র ৩১ দিনের। এটাকে কীভাবে বাড়ানো যায়, তারা সেটা দেখতে বলেছেন। এখন ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। তারা এ বিষয়ে ফরেনসিক অডিটের কথা বলেছেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, রান্নার এলপিজির সিলিন্ডার এখন ২ হাজার ৫০০-৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বাজারে সরকার অনুপস্থিত, কোনো নজরদারি নেই। তারা সরকারের নজরদারি বাড়ানোর কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেন, ভবনের ছাদে ৫০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনায় ১৫০ কোটি টাকার মতো খরচ হওয়ার কথা। কিন্তু সরকারের প্রকল্পে দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৩৫০ কোটি টাকার ওপরে। তারা মন্ত্রণালয়কে আগামী বৈঠকে এ ধরনের প্রকল্পে কোন খাতে কত খরচ ধরা হয়েছে, তার বিবরণ দিতে বলেছেন। তিনি বলেন, বিটিভি ও বাসসকে ব্যবহার করে এক ধরনের অসত্য তথ্য প্রচার করা হয়েছে যে সরকার এই কিছুদিনের মধ্যে ৩২টি গ্যাস কূপ খনন করেছে। এগুলো কোথায় তা জানানো উচিত।
বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভবনের ছাদের সোলার প্যানেল থেকে কতটুকু বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে, তা আগামী বৈঠকে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিটি। বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ২২ মেগাওয়াট। আর প্রকৃত উৎপাদন ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা ৬ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট, আর প্রকৃত উৎপাদন ৫-৬ হাজার মেগাওয়াট। তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা ৬ হাজার ৪০৯ মেগাওয়াট আর প্রকৃত উৎপাদন আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট।
জানা গেছে, বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে অভাবনীয় এক বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। ২৮ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে। শুরু হয় যুদ্ধ। এই যুদ্ধের অভিঘাত মধ্যপ্রাচ্যে ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় পরিবহন খরচও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর হওয়ায় খুব স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের সংকটটা আরও প্রকট। পেট্রলপাম্পগুলোতে জ্বালানির জন্য গাড়িগুলোর দীর্ঘ লাইন, ঘন ঘন লোডশেডিং, শিল্পকারখানার উৎপাদন থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির রান্না—জ্বালানির সংকট সবখানেই ভোগান্তি তৈরি করছে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি উৎপাদনসহ গেটা অর্থনীতিতেই এর অভিঘাত পড়ছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম দেড় মাস জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালেও এপ্রিল মাসে এক দফা দাম বাড়ায় সরকার। এর মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়। এরপর সম্প্রতি সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম একলাফে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। দুই দফা মিলিয়ে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম বেড়েছে ৩৫-৪৫ টাকা।
কে দাম বাড়াচ্ছে সরকার
সরকার তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে দুটি যুক্তি তুলে ধরেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির ভর্তুকি কয়েক গুণ বেড়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জ্বালানি তেলের দামের একটি চিত্র দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে তেলের দাম কম হওয়ায় পাচারের শঙ্কা থেকে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
এটা সত্যি যে ইরান যু্দ্েধর কারণে বিশ্ববাজারে যে অভাবনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে সরকার অনেক বেশি চাপে পড়েছে। কিন্তু একলাফে ২০ টাকা বাড়ানোর বিকল্প কি ছিল না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম যদি এ রকম বেশিই থাকে তাহলে সব ধরনের জ্বালানির দাম ২০ টাকা বাড়ানোয় বছর শেষে বিপিসির লোকসান কমবে ১০ হাজার কোটি টাকা।
এ জায়গায় সরকারি ভাষ্যে দুটি ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা রয়েছে। অতীতে জ্বালানি তেল বিক্রি করে বিপিসি বিপুল অঙ্কের টাকা মুনাফা করেছে। বিপিসি প্রকাশিত নিরীক্ষা বলছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে সংস্থাটি প্রায় ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার নিট মুনাফা অর্জন করেছে। তাহলে ১০ বছর ধরে বিপুল অঙ্কের মুনাফা করার পর ইরান যুদ্ধের পাঁচ মাসে লোকসানের প্রশ্নটি কেন সামনে আনা হচ্ছে। এমন প্রশ্ন সামনে আসছে।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি হচ্ছে, এক লিটার জ্বালানি তেলে সরকার শুল্ক ও কর আরোপ করে রেখেছে প্রায় ৩১ শতাংশ। এখানে শুল্ক ও কর কমালে সরকারকে একলাফে তেলের দাম ২০ টাকা বাড়াতে হতো না। এ ছাড়া জ্বালানি খাতের অদক্ষতা, সিস্টেম লসের নামে যে সিস্টেমেটিক চুরি, দুর্নীতি ও অপচয় সেটা বন্ধে আগের সরকারগুলোর মতো এই আমলেও কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় নি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের অন্যতম যুক্তি হলো, পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে দাম কম হওয়ায় পাচার হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ২০ টাকা দাম বাড়ানোর পর এখন ভারতের দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাইয়ের তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেলের দাম বেশি। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীতে ডিজেলের দাম ৯৫ দশমিক ৪৪ রুপি। বাংলাদেশি টাকায় ১২২ টাকা ২৪ পয়সা। মুম্বাইতে ডিজেলের দাম ছিল ৯৭ দশমিক ৮৩ রুপি বা ১২৫ টাকা ৩০ পয়সা ও কলকাতায় ৯৯ দশমিক ৮২ রুপি বা ১২৭ টাকা ৮৫ পয়সা। বর্তমানে ভতানে ডিজেলের দাম প্রতি লিটার বাংলাদেশি টাকায় ১৩৩ টাকা ৭৬ পয়সা। মালদ্বীপে ১৩৯ টাকা ২৯ পয়সা, নেপালে ১৫৬ টাকা ২৫ পয়সা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৭ টাকা ৫৯ পয়সা। পাকিস্তানে ১৮৭ টাকা ৯৩ পয়সা।
তথ্য উপদেষ্টা ডা: জাহেদ সম্প্রতি সচিবালয়ে বলেন, আমরা যে পরিমাণ ভর্তুকি জ্বালানি হিসেবে দিচ্ছি, যদি এই তরল জ্বালানির সাথে গ্যাস এবং বিদ্যুৎকে যোগ করি, তাহলে দেখুন কত বড় অঙ্কের ভর্তুকি আছে। এই ভর্তুকি কমাতে হবে। এটা খুবই বেসিক অর্থনৈতিক জ্ঞান দিয়ে আমরা বুঝতে পারি। তিনি বলেন, এখন কতুকু কমাব, কোনটায় কতুকু কমানো যেতে পারে, আমরা হয়তো সেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।
জাহেদ উর রহমান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে আইএমএফের কোনো শর্তের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত করে দেখার সুযোগ নেই। সরকারের মূল বিবেচনা হচ্ছে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতে দেয়া ভর্তুকির পরিমাণ কমানো এবং এ ক্ষেত্রে কতো সমন্বয় করা হবে, তা নির্ধারণ করা।
