কালবেলা · সাধারণ
টুপটুপ রিসোর্টে আগুন: এখনও নিখোঁজ ছাত্রদল নেতার স্ত্রী
১৮/১০/২০২৬

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে কমিটির সদস্যরা পুড়ে যাওয়া রিসোর্টটি ঘুরে দেখেন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন। রিসোর্টটির নির্মাণে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তদারকির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে কমিটি।
এদিকে, আগুনে পুড়ে নিহত ১০ মরদেহের পরিচয় শনাক্তের কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি আরও একজন নিখোঁজ থাকতে পারেন এমন তথ্যের ভিত্তিতে সকাল থেকে ধ্বংসস্তূপে নতুন করে তল্লাশি শুরু করেছে ফায়ার সার্ভিস।
জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন ঢাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার। দুই বান্ধবীর সঙ্গে রিসোর্টটিতে উঠেছিলেন তিনি। তার স্বামী দেওয়ান ফয়সাল কক্সবাজারে এসে রিসোর্ট ও হাসপাতালে খোঁজ নিয়েও স্ত্রীর সন্ধান পাননি। তার খোঁজেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত রিসোর্টে তল্লাশি চালানো হয়।
নাসরিন আক্তার আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার স্বামী দেওয়ান ফয়সাল ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের সহসভাপতি।
তবে স্ত্রীর লাশ নিতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে এসে দেওয়ান ফয়সাল জানান, তার ধারণা উদ্ধার হওয়া ১০ লাশের মধ্যে তার স্ত্রীর লাশও রয়েছে।
ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া পরিচয় নিশ্চিত নয়
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ১০টি মরদেহ উদ্ধার করেছি। এর মধ্যে অনেকের নিকটাত্মীয় আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাদের নাম-ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য পেয়েছি। তবে মরদেহগুলো যে অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে, তাতে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না, কোন মরদেহ কার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আরও একজনের বিষয়ে তথ্য পেয়েছি। তবে দুর্ঘটনার সময় তিনি এখানে ছিলেন, নাকি বাইরে ছিলেন, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি।’
তাসনীম জাহান জানান, ওই ব্যক্তির অবস্থান নিশ্চিত করতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল কাজ করছে। মোবাইল ফোন নম্বরের মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করা বা তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা রিসোর্টটির নির্মাণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন ছিল কি না, অগ্নিনিরাপত্তাসহ অন্যান্য নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের সঙ্গে রিসোর্টসংক্রান্ত নথিপত্র ও অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। কমিটিতে বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। তারা নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে কারিগরি বিষয়গুলো মূল্যায়ন করবেন। পাশাপাশি বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, তদারকি ও সমন্বয়ের বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
অনুমোদনহীন স্থাপনা নিয়ে কউকের বক্তব্য
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনেক জায়গায় দেখবেন, তাদের ব্যবসা করার পারমিশনই নাই, তারপরও তারা এখানে ব্যবসা করছে। এটা অপরাধ।’
তিনি বলেন, ‘২০২৩ ও ২০২৪ সালে তাদের স্থাপনাগুলো অপসারণের নির্দেশ দিয়েছি। এতবার বলার পরও যখন কেউ তা মানে না, তখন সমস্যা তৈরি হয়। এখানে যে অবস্থায় স্থাপনাটি রয়েছে, তা কোনোভাবেই কোনো স্ট্যান্ডার্ড স্ট্রাকচার নয়।’
ফজলে রাব্বির বক্তব্য অনুযায়ী, অনুমোদনহীন স্থাপনা ও নির্দেশনা অমান্য করে ব্যবসা পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছে কউক। তদন্তে রিসোর্টটির অনুমোদন ও নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ধ্বংসস্তূপে আরও একজনের সন্ধানে তল্লাশি
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার বলেন, ‘হিসাব অনুযায়ী এখনও একজন ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। গতকাল (শনিবার) অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধ্বংসস্তূপের সব জায়গায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খোঁজা সম্ভব হয়নি।’
তিনি জানান, শনিবার অগ্নিকাণ্ডের পর ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ১১ জন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি সামনে আসে। রিসোর্টটির ওপরের তলাগুলো কাঠের তৈরি হওয়ায় সেগুলো ভেঙে নিচে পড়েছে। ফলে নিচতলায় কেউ চাপা পড়ে থাকতে পারেন। এ কারণে নতুন করে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মরদেহগুলো পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ফরেনসিক পরীক্ষা ছাড়া সেগুলো ঠিক ১০ জনের, নাকি এর চেয়ে বেশি মানুষের, তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
হিমঘরে ১০ মরদেহ, স্বজনদের অপেক্ষা
টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ১০ পর্যটকের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। স্বজনরা মরদেহ নিতে হাসপাতালে ভিড় করলেও পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় সেগুলো হস্তান্তর করা হচ্ছে না। পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে কোন মরদেহ কার, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বাকি চারজনের পরিচয়ও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘মরদেহগুলো পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’
উল্লেখ্য, কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের ছয়জনসহ ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। উখিয়া থানার এসআই আশীষ সূত্রধর বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এ ঘটনায় রিসোর্টের ম্যানেজার জাহিদ হোসেন সুমনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মালিক তানভীর আহমদ ও অংশীদার নিয়াজ মোরশেদসহ অন্য আসামিরা পলাতক রয়েছেন।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗