ফ্রান্সে সপ্তাহজুড়ে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও গ্রেপ্তারের ঘটনার পর নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সপ্তাহান্তে দেশটির বিভিন্ন শহরে ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিক্ষোভ মোকাবিলায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, জিম্মি উদ্ধার ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় ব্যবহৃত বিশেষায়িত বাহিনীকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা, রাতের
কারফিউ ও মিছিলের নির্দিষ্ট পথ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে প্যারিসের পশ্চিমে ত্রাপ শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় শুক্রবার সকালে এক বন্দুকধারীর গুলিতে একজন নিহত এবং অন্তত চারজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১২ বছর বয়সী এক মেয়েও রয়েছে। পরে পার্শ্ববর্তী কোয়েনিয়ের শহর থেকে সন্দেহভাজন বন্দুকধারীকে আটক করা হয়। ঘটনাটিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ। ত্রাপের মেয়র আলি রাবেহের অভিযোগ, এটি বর্ণবাদী এবং সম্ভবত ইসলামবিদ্বেষী হামলা।
ফরাসি সরকারের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপের মধ্যেই শনিবার দেশজুড়ে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও বিভিন্ন সংগঠনের বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে। সরকারের বিধিনিষেধের সমালোচনা করেছেন বামপন্থি রাজনীতিক, আইনজীবী, শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিক অধিকারকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, বিক্ষোভের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার সীমিত করছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, সপ্তাহান্তে শহরগুলোর রাস্তায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হবে। জেন্ডারমেরি হলো সামরিক মর্যাদাসম্পন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যারা ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে। দাঙ্গা দমনকারী দল, বিশেষায়িত ইউনিট এবং প্রশিক্ষণরত পুলিশ সদস্যদেরও দায়িত্ব পালনে যুক্ত করা হচ্ছে।
নুনেজ বলেন, সরকার এমন একটি বাহিনী প্রস্তুত করছে, যারা অত্যন্ত দ্রুত চলাচল করতে পারবে, পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে এবং কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করবে। সরকারি ও জনসাধারণের ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোর নিরাপত্তায় বিশেষ দল মোতায়েন থাকবে।
সামাজিক মাধ্যমে বামপন্থিদের পক্ষ থেকে সরকারি ভবন লক্ষ্যবস্তু করার আহ্বান আসার কথা উল্লেখ করে এসব বাহিনীর সম্পৃক্ততার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো শান্তিপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ বিক্ষোভের কথা বলছি না। আগামীকাল আমরা অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত এবং কোনো কিছুই সহ্য করব না।’
এর আগে বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের নিয়ে নিরাপত্তাবিষয়ক বৈঠক করেন। শুক্রবার সকালে তার সভাপতিত্বে প্রতিরক্ষা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেশজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বিক্ষোভ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়। শুক্রবার রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করতে অর্লেয়ঁ শহরে যাওয়ার কথা রয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের। সেখানে উগ্র ডানপন্থি ন্যাশনাল র?্যালির সম্মেলন এবং এর প্রতিবাদে পাল্টা বিক্ষোভ হওয়ার কথা রয়েছে।
ফ্রান্সের প্রধান ছাত্র সংগঠন ইউএনইএফ শনিবার বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোও দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের পক্ষ থেকে প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকায় মিছিলের পরিকল্পনা জানানো হয়েছে।
অর্লেয়ঁ শহরে উগ্র ডানপন্থি ন্যাশনাল র?্যালির সম্মেলনকে কেন্দ্র করে পাল্টা বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে। সেখানে প্রায় ৩০ হাজার বিক্ষোভকারী সমবেত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। দলটির নেতা মেরিন লো পেনের আয়োজনে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি রয়েছে। ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেই এবং তৃতীয় বৃহত্তম শহর লিওঁতে সাধারণভাবে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর কয়েকটি মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের বাস্তিল ও নাসিওঁ চত্বরের মধ্যবর্তী নির্ধারিত পথে মিছিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মার্সেইয়ের কর্তৃপক্ষ শনিবার গণপরিবহন বন্ধ রাখার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিরোধিতা দেখা দেওয়ার পর তা প্রত্যাহার করা হয়।
বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। মার্সেইয়ে প্রথমে সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হলেও শুক্রবার বিকালে কর্তৃপক্ষ একটি শ্রমিক সংগঠনকে মিছিল করার অনুমতি দেয়। লিওঁসহ অন্যান্য শহরেও নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ নিয়ে আইনি লড়াই চলছে।
বিক্ষোভ ও সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কায় ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পর্যটনকেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ রাখা হচ্ছে। অনেক দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জানালা ও প্রবেশপথ কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে। মার্সেইয়ের ব্যবসায়ী পরিষদও দোকানপাট বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
প্যারিসের বিখ্যাত ল্যুভর জাদুঘর শনিবার বন্ধ থাকবে। ওর্সে জাদুঘরও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্যারিসে চলমান আর্ট বাসেল শিল্পমেলাও নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ করা হচ্ছে।
