মাইকে ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’ বলে চোরবাগান বিপর্যয়ের তদন্তে যে ঘোষণার কথা উঠে এসেছে, তাতে মূল অভিযুক্ত দু’জনকেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রথম জন সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু। দ্বিতীয় জন কুশল মজুমদার। তিনি গ্রেফতার হয়েছেন শুক্রবার সকালে। তার পরেও তাঁর ফেসবুক পেজ থেকে একের পর এক পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে হাতে লেখা নোটে জানানো হয়েছে, সপ্তমীর সন্ধ্যায় কী ঘটেছিল চোরবাগানের মণ্ডপে। কেন তিনি ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’ বলে ঘোষণা করেছিলেন! প্রশ্ন উঠছে, গ্রেফতারির পরেও কী ভাবে ধৃতের ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের একটি সূত্র যদিও দাবি করেছে, গ্রেফতারের পরে কুশলের সমাজমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার কোনও সুযোগই নেই।
সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগানে যখন দর্শনার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল, তখন মাইকে ঘোষণা হয়— ‘‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে!’’ অভিযোগ, ওই ঘোষণাই দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছিল। কে বা কারা ওই ঘোষণা করেছিলেন, তার অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশ। আগেই সন্দেহভাজন দুই ঘোষককে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এক জনকে গ্রেফতার করা হলেও অপর জনকে পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে সেই দ্বিতীয় ব্যক্তিও গ্রেফতার হন শুক্রবার সকালে।
পুলিশের একটি সূত্র বলছে, শুক্রবার সকালে হেয়ার স্ট্রিট থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন চোরবাগান মণ্ডপের সেই ঘোষক কুশল। গ্রেফতারির পরেও তাঁর ফেসবুক পেজ থেকে একের পর এক পোস্ট করা হয়েছে। হাতে লেখা একটি নোটে কুশল দাবি করেছেন, তিনি গত ২০ বছর ধরে চোরবাগানের পুজোর সঙ্গে যুক্ত। সপ্তমীর রাতে যে ঘটনা চোরবাগানে ঘটেছিল, তার জন্য সকল সদস্যের হয়ে ক্ষমাও চান তিনি।
কুশলের দাবি, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে তিনি ক্লাবে গিয়েছিলেন। সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন গিরিশ পার্ক থানার ‘বড় বাবু এবং ছোট বাবু’। তাঁরা চা খাবেন বলায় তিনি এবং ক্লাবের অন্য এক সদস্য চা আনতে গিয়েছিলেন। তাঁদের চা দেওয়ার পরে ক্লাবে বসেই কিছু কাজ করছিলেন বলে লেখেন কুশল। ১০-১৫ মিনিট পরে একটি শব্দ শুনতে পান তাঁরা। তা শুনে থানার বড় বাবু এবং ছোট বাবু বেরিয়ে যান ক্লাবঘর থেকে। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের ক্লাবের সম্পাদকের পুত্র কবির এসে বলে, ‘মণ্ডপের পিছনের অংশ ভেঙে পড়েছে’। সেই সময় আমি যখন বেরিয়ে যাব, তখন পুলিশের এক আধিকারিক বলেন, আপনারা মাইকিং করুন। আমি সামনে গিয়ে দেখি, যে মাইকিং করছিল, সে নেই।’’ কুশল দাবি করেছেন, তার পর ‘বাধ্য হয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও’ তিনি মাইকে ঘোষণা করেন।
ধৃত দাবি করেছেন, প্রথমে পুলিশকে দিয়ে তিনি মণ্ডপে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেন। সব রকম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। তার পরেই ওই নোটে কুশল জানিয়েছেন, কেন তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’। তিনি লেখেন, ‘‘যেহেতু কবির বলেছিল, মণ্ডপের পেছনের অংশ ভেঙে গেছে, তাই আমি বলি, ‘আপনারা মণ্ডপে প্রবেশ করবেন না’। মূল মণ্ডপের অবস্থা খুব খারাপ। এত দর্শক একসঙ্গে প্রবেশ করলে মণ্ডপের ভিত আলগা হয়ে ভেঙে পড়তে পারে।’’ তাঁর আরও দাবি, ‘‘এতে আমার কোনও খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না।’’ কুশল এ-ও দাবি করেছেন, মাইকের মুখ মণ্ডপের ভিতরে বা মাঠের দিকে ছিল না। বরং মাইকের মুখ ছিল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট, অমর বসু সরণি এবং পার্বতী ঘোষ লেনের মধ্যে। মণ্ডপের সামনে ছোট লাল মাইকে শুধুই থিমের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সঙ্গীত চলছিল। মণ্ডপের ভিতর থেকে তা অপারেট করা হয়।
প্রশ্ন উঠেছে, গ্রেফতারির পরেও কী ভাবে কুশল এ সব পোস্ট দিচ্ছেন। পুলিশের সূত্র স্পষ্ট জানিয়েছে, ধৃতের পোস্ট দেওয়ার সুযোগই নেই। মনে করা হচ্ছে, তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁর কোনও পরিচিত বা আত্মীয়ই এই পোস্ট দিয়েছেন।
চোরবাগানের বিপর্যয়ের পর সমাজমাধ্যমে বেশ কয়েকটি ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ে। যদিও সেই সব ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম। এমনই এক ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছিল, গ্রিলে ঘেরা ঘোরানো উড়ালপথের উপরেই অসুস্থ হয়ে পড়ে গিয়েছেন কয়েক জন দর্শনার্থী। অন্য একটি ভিডিয়োয় দেখা যায়, বাইরে যাওয়ার গেট থেকে মণ্ডপের ৮-১০ মিটার ভিতরে প্রবল ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কির মধ্যে মাটিতে পড়ে গিয়েছেন কয়েক জন। আতঙ্কে অনেকে চিৎকার করছেন। এক পুলিশকর্মী ক্রমাগত কাউকে ফোন করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছেন। তাঁকে ধরে এক জন মাটি থেকে উঠে দাঁড়ানোরও চেষ্টা করছেন। এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেই মণ্ডপ থেকে কেউ মাইকে ঘোষণা করেন, ‘‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে।’’
সেই ঘোষণায় সবাইকে দ্রুত মণ্ডপ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে অনুরোধ করা হয়। মাইকের ওই ঘোষণায় আরও আতঙ্ক ছড়ায় দর্শনার্থীদের মধ্যে। আরও হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায় বলে দাবি প্রত্যক্ষদর্শীদের। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া সিসি ক্যামেরার ফুটেজও সেই ঘোষণার বিষয়টিকে সমর্থন করে।
