সংবাদ · আন্তর্জাতিক
৮১ বছরে জাতিসংঘ: বিশ্ব কি আগের চেয়ে নিরাপদ?
২৪/১০/২০২৬

১৯৪৫ সালে বিশ্ব যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন একটি প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল জাতিসংঘ–ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ৮১ বছর। এই সময়ে বদলেছে পৃথিবী, বেড়েছে প্রযুক্তির শক্তি, বিস্তৃত হয়েছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। কিন্তু যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি আর মানবিক বিপর্যয়ের খবর এখনো থামেনি। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে–যে বিশ্বকে নিরাপদ করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে জাতিসংঘের জন্ম, সেই বিশ্ব কি সত্যিই আগের চেয়ে নিরাপদ? নাকি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সংস্থাটির সেই প্রতিশ্রুতিই বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে?
৮১ বছর পরও কেন প্রশ্নের মুখে জাতিসংঘ?দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা ছিল, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই ১৯৪৫ সালে যাত্রা শুরু করে জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো ছিল সংস্থাটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৮১ বছর পরও বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকটের বাস্তবতা সেই প্রত্যাশার পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।প্রতি বছর ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস পালিত হয়। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থাটির জন্ম হয়। বর্তমানে ১৯৩টি সদস্যদেশের এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বশান্তি রক্ষা থেকে শুরু করে মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। তবু আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক থামেনি।জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। ছবি: জাতিসংঘএর অর্থ অবশ্য এই নয় যে জাতিসংঘের সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে সংস্থাটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে, সংকটাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং সংঘাত মোকাবিলায় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু পরাশক্তিগুলোর বিরোধ, নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ব্যবস্থা এবং সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় কার্যকর পদক্ষেপের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে প্রশ্নটি কেবল জাতিসংঘ সফল না ব্যর্থ, তা নয়; বরং বদলে যাওয়া বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংস্থাটি কতটা সক্ষম এবং আরও কার্যকর হতে তার কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।এই ছবিতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত ‘অ্যালি অফ ফ্ল্যাগস’ (Alley of Flags) নামক একটি পর্যটন আকর্ষণ দেখানো হয়েছে। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে জাতিসংঘের জন্মপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯১৯ সালে গড়ে ওঠে লীগ অব নেশনস। কিন্তু আগ্রাসন ঠেকাতে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধে সংস্থাটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্বনেতাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয়, আন্তর্জাতিক বিরোধ মীমাংসা ও সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন।এই উপলব্ধি থেকেই ১৯৪৫ সালে সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলনে ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা জাতিসংঘ সনদ প্রণয়ন করেন। ২৬ জুন সনদে স্বাক্ষর করা হয় এবং প্রয়োজনীয় অনুসমর্থন সম্পন্ন হওয়ার পর ২৪ অক্টোবর তা কার্যকর হয়। প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, দেশগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং মানবাধিকার ও উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানো।১৯৪৫ সালের ২৬ জুন ‘ভেটেরানস ওয়ার মেমোরিয়াল বিল্ডিং’-এ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে, দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী ফিল্ড মার্শাল ইয়ান ক্রিশ্চিয়ান স্মুটস জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষর করছেন।জাতিসংঘের ছয়টি প্রধান অঙ্গের মধ্যে সাধারণ পরিষদে সব সদস্যদেশের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে; নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান দায়িত্ব পালন করে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং আইনি বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার কাজ করে। এই কাঠামোর মধ্য দিয়েই জাতিসংঘ বিশ্বসমস্যা সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগের একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ হয়ে ওঠে।জাতিসংঘ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিন তথ্য।
৮১ বছরে জাতিসংঘের অর্জন কতটা?সব যুদ্ধ থামাতে না পারলেও মানুষের জীবন রক্ষা, সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে জাতিসংঘ। ১৯৪৮ সাল থেকে সংস্থাটির শান্তিরক্ষা কার্যক্রম সংঘাতকবলিত বিভিন্ন দেশে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে সহায়তা দিয়ে আসছে। কম্বোডিয়া, নামিবিয়া, লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনের মতো দেশে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম রাজনৈতিক উত্তরণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছে। তবে এসব সাফল্যের পাশাপাশি অনেক সংঘাতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি।জাতিসংঘের অর্জন শুধু শান্তিরক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়। শরণার্থী সুরক্ষা, দুর্যোগে জরুরি সহায়তা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং শিশুস্বাস্থ্যেও সংস্থাটির বিভিন্ন অঙ্গ কাজ করছে। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংস্থাটির বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে ১৩ কোটি ৬০ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ সহায়তা ও সুরক্ষা পেয়েছে। একই সময়ে ১১০ মিলিয়ন বা ১১ কোটি মানুষকে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়েছে। শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমও বিশ্বব্যাপী রোগ প্রতিরোধ ও জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।যুদ্ধ ও সংকটে মানুষের জীবন রক্ষা, খাদ্যসহায়তা এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তায় কাজ করছে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও শান্তিরক্ষা মিশন।মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক আইন শক্তিশালী করা এবং দারিদ্র্য হ্রাসে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নেও জাতিসংঘ সদস্যদেশগুলোকে সহযোগিতা করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ক্ষুধা ও বৈষম্যের মতো সীমান্ত অতিক্রম করা সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সমন্বয় গড়ে তোলাও সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ কাজ।তবে অর্জনের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থের ঘাটতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বাধায় অনেক উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল পায় না। ফলে জাতিসংঘের সাফল্য বিচার করতে হলে শুধু কতটি যুদ্ধ থামানো গেছে, তা নয়; সংকটে কত মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা কতটা এগিয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।ছবি: এআই দ্বারা নির্মিত
যুদ্ধের সামনে জাতিসংঘ এত অসহায় কেন?বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে গড়ে ওঠা জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয় যখন কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ। এর কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ব্যবস্থা। ১৫ সদস্যের এই পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন স্থায়ী সদস্য। গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রস্তাব পাসের ক্ষেত্রে এই পাঁচ দেশের যেকোনো একটির নেতিবাচক ভোট প্রস্তাব আটকে দিতে পারে। ফলে অধিকাংশ সদস্য সমর্থন করলেও রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে জরুরি পদক্ষেপ থেমে যেতে পারে।গাজার যুদ্ধ পরিস্থিতি এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, জিম্মিদের মুক্তি এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে একটি খসড়া প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। পরিষদের বাকি ১৪ সদস্য প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে তা গৃহীত হয়নি। ঘটনাটি দেখায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সমর্থন থাকলেও নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোয় একক স্থায়ী সদস্যের বিরোধিতা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।ইউক্রেন যুদ্ধও একই ধরনের কাঠামোগত সমস্যার দৃষ্টান্ত। রাশিয়া নিজেই নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং ইউক্রেনে তার সামরিক অভিযান নিয়ে উত্থাপিত কিছু প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। অর্থাৎ, যে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে পরিষদে পদক্ষেপের প্রশ্ন ওঠে, সেই রাষ্ট্রও সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা রাখে। এতে পরিষদের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।সমস্যা শুধু ভেটোতেই সীমাবদ্ধ নয়। নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তব সক্ষমতা প্রয়োজন। সাধারণ পরিষদে ব্যাপক সমর্থনে গৃহীত প্রস্তাবও সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত নয়। ফলে জাতিসংঘের কূটনৈতিক উদ্যোগ ও বাস্তব পরিবর্তনের মধ্যে ব্যবধান থেকে যায়।ছবি: এআই দ্বারা নির্মিততবু জাতিসংঘকে পুরোপুরি অকার্যকর বলা ঠিক হবে না। মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি ও আলোচনার ক্ষেত্র তৈরিতে এর ভূমিকা রয়েছে। মূল সংকট হলো, বিশ্বশান্তির দায়িত্ব দেওয়া হলেও সংস্থাটির সিদ্ধান্ত গ্রহণব্যবস্থা এখনো বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক স্বার্থের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
পাঁচ দেশের হাতে কেন বিশেষ ক্ষমতা?দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার সময় বিজয়ী প্রধান শক্তিগুলোর সম্মতিকে আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার জন্য অপরিহার্য মনে করা হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতা থেকেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনকে স্থায়ী সদস্য করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি হিসেবে বর্তমানে রাশিয়া সেই আসন ধরে রেখেছে। এই পাঁচ দেশের হাতে দেওয়া হয় ভেটো ক্ষমতা, যার মাধ্যমে তাদের যেকোনো একটি দেশ নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ অ-প্রক্রিয়াগত প্রস্তাব আটকে দিতে পারে।নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে নিরাপত্তা পরিষদের কক্ষ। ছবি: জাতিসংঘতবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ক্ষমতার ভারসাম্যকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই কাঠামো বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশের অভিযোগ, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের প্রতিনিধিত্ব পর্যাপ্ত নয়। অথচ এসব অঞ্চলের দেশগুলোও আন্তর্জাতিক শান্তি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।নিরাপত্তা পরিষদে প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং ভেটো ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি তাই ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যমান কাঠামো পরিবর্তনে স্থায়ী সদস্যদের সম্মতি প্রয়োজন হওয়ায় সংস্কারের পথও জটিল। ফলে প্রশ্ন থেকে যায়–একবিংশ শতাব্দীর বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে ১৯৪৫ সালের ক্ষমতার কাঠামো কত দিন কার্যকর থাকবে?
বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘ কতটা গুরুত্বপূর্ণ?বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘের গুরুত্ব কেবল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; শান্তিরক্ষা, মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার মতো ক্ষেত্রেও সংস্থাটির ভূমিকা রয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার অন্যতম ক্ষেত্র। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সেনা ও পুলিশ সদস্য পাঠানো দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ বৃহত্তম অবদানকারী। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশি সদস্যরা। ছবি: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা – বাংলাদেশি সদস্যদের কার্যক্রম রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘের ভূমিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয় ও সুরক্ষায় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রয়োজন তুলে ধরা হয়েছে। তবে অর্থায়নের ঘাটতি এবং মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা সংকট সমাধানের পথে বড় বাধা। কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও মৌলিক চাহিদা পূরণে কাজ করছে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা। ছবি: ইউএনএইচসিআরএ ছাড়া দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গসমতা ও পরিবেশ সুরক্ষায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে সহযোগিতা করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে জাতিসংঘের সহায়তা সব সমস্যার সমাধান নয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন জোগাড় করা কিংবা জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় বৈশ্বিক পদক্ষেপ আদায় করার ক্ষমতা সংস্থাটির একার হাতে নেই। বাংলাদেশের প্রত্যাশা তাই শুধু সহায়তা পাওয়া নয়; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ন্যায্যতা, কার্যকর কূটনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য জাতিসংঘকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা।
বদলে যাওয়া বিশ্বের সঙ্গে জাতিসংঘ কি বদলাবে?দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা প্রতিফলিত করতে জাতিসংঘের সংস্কারের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের পুনর্গঠন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। ভেটো ক্ষমতার ব্যবহার সীমিত করার দাবিও সংস্কার আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০২৪ সালে গৃহীত ‘প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার’-এ নিরাপত্তা পরিষদকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।তবে সংস্কারের প্রস্তাব থাকলেই পরিবর্তন নিশ্চিত হয় না। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের স্বার্থ, নতুন সদস্যপদের ধরন নিয়ে মতভেদ এবং ভেটো ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভাজন ঐকমত্যের পথে বড় বাধা। জাতিসংঘ সনদ সংশোধনের জন্যও কঠিন অনুমোদনপ্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।পরিবর্তিত বিশ্ববাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জাতিসংঘের সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় ভবিষ্যৎ সম্মেলন। ছবি: জাতিসংঘ – Pact for the Future সম্মেলচ্যালেঞ্জ শুধু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু সংকট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি, সাইবার নিরাপত্তা, অপতথ্য ও নতুন ধরনের সংঘাত মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং আগাম প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। ২০২৪ সালের প্যাক্টের সঙ্গে গৃহীত বৈশ্বিক ডিজিটাল চুক্তি প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার একটি কাঠামো দিয়েছে। কিন্তু এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থায়ন ও পারস্পরিক আস্থা অপরিহার্য। শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে–বিশ্বনেতারা সংস্কারের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব পদক্ষেপে কতটা রূপ দিতে পারেন তার ওপর।
জাতিসংঘের বিকল্প কী?৮১ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, জাতিসংঘ বিশ্বকে সব যুদ্ধ, সংঘাত কিংবা মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারেনি। পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব, ভেটো ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় সংস্থাটির কার্যকর ভূমিকার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতার অর্থ এই নয় যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। শান্তিরক্ষা, মানবিক সহায়তা, মানবাধিকার, জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রে জাতিসংঘ এখনো দেশগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের প্রধান সদর দপ্তর। বরং বর্তমান বিশ্বের সংকটগুলো আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে, একক কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে সব বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যেখানে বড় ও ছোট রাষ্ট্রের স্বার্থের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকারও গুরুত্ব পাবে। তাই প্রশ্নটি জাতিসংঘ থাকবে কি না, তা নয়; বরং সংস্থাটিকে কীভাবে আরও কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করা যায়। বিশ্বকে নিরাপদ করতে জাতিসংঘকে দুর্বল করা, নাকি প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা–সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত বিশ্বনেতাদেরই নিতে হবে।/
মূল প্রতিবেদনে যান ↗