নোবেল শান্তি পুরস্কার বিষয়টি কখনোই খুব সহজ হিসাব ছিল না। শুরুতেই বলা যায়, অন্যান্য নোবেল পুরস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা এটি দেন না; এটি দেয় নরওয়ের পার্লামেন্ট কর্তৃক মনোনীত পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি। এই পাঁচ ব্যক্তি নির্ধারণ করেন বিশ্বশান্তির জন্য কে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন, যদিও শান্তির সংজ্ঞা নিয়ে তাদের বোঝাপড়া দীর্ঘকাল ধরেই রাজনৈতিক বিবেচনা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এসেছে।
বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নতুন কোনো ঘটনা নয়। যেমন- সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কর্ডেল হলের কথাই ধরা যাক, যিনি জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য ১৯৪৫ সালে এই পুরস্কার পেয়েছিলেন।
হাল একজন দক্ষ কূটনীতিক ছিলেন, কিন্তু কেবল তাকেই কেন দেওয়া হলো? সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলনে মস্কোর প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বদানকারী সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিয়াচেস্লাভ মোলোতোভ কিংবা পরবর্তীতে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়া আন্দ্রে গ্রোমিকোও তো এই পুরস্কারের সমান দাবিদার ছিলেন। কারণ, আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতে সহায়ক নিয়মকানুনসহ জাতিসংঘ গড়ে তোলার পেছনে সোভিয়েত প্রতিনিধিদলেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
তা সত্ত্বেও কর্ডেন হালই এই সম্মান পান। এর কারণ হলো, ততদিনে ওয়াশিংটন পশ্চিম ইউরোপের ওপর নিজেদের প্রভাব শক্ত করতে শুরু করেছিল এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে মার্কিন পছন্দ-অপছন্দগুলো বেশি করে প্রতিফলিত হতে শুরু করে।
হাল নিজেও বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। যুদ্ধের আগে নাৎসি জার্মানির প্রতি তাঁর মনোভাব আজকের দিনে মানুষ যেমনটা আশা করবে, সবসময় তেমন ছিল না। এমনকি অ্যাডলফ হিটলারকেও একবার নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল- যদিও সেই মনোনয়নটি ছিল আদতে একটি প্রতিবাদ, আন্তরিক কোনো সমর্থন নয়।
১৯৪৫ সালের পর থেকে এই পুরস্কারটি ক্রমশ পশ্চিমা রাজনৈতিক অগ্রাধিকারকে প্রতিফলিত করতে শুরু করে। আমেরিকা ও ব্রিটেনের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা সামনে চলে আসেন, আর যেসব দেশ থেকে সাধারণত ঐতিহ্যগতভাবে নোবেল পেত (যেমন- নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড), সেসব দেশের মনোনীতদের গুরুত্ব কমতে থাকে।
অন্যান্য অঞ্চল থেকে যাদের সম্মানিত করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারী ছাড়াও এমন কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন যাদের শান্তির অবদান বেশ বিতর্কিত।
লেখ ওয়ালেসা এবং মিখাইল গর্বাচেভের কথাই ধরুন। দুজনেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের আন্তর্জাতিক প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু সেই পরিবর্তনের পরিণতি কিন্তু সব জায়গায় শান্তিপূর্ণ ছিল না। গর্বাচেভের দুর্বল নেতৃত্ব সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে ভূমিকা রেখেছিল, যার পরপরই ককেশাস অঞ্চল জুড়ে সংঘাত ও নানা অশান্তির সৃষ্টি হয়। আবার আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সমর্থন তুলে নেওয়ার কারণে সেখানকার ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের পতন ঘটে।
পশ্চিমা বিশ্ব এই ঘটনাগুলোকে স্বাধীনতার বিজয় হিসেবে উদযাপন করলেও এর সামাজিক ও মানবীয় পরিণতি ছিল বেশ জটিল।
তবে আধুনিক যুগের সবচেয়ে অদ্ভুত সিদ্ধান্তটি ছিল সম্ভবত ২০০৯ সালে বারাক ওবামাকে নোবেল দেওয়া।
ওবামা তখন মাত্র নয় মাস হলো প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে এসেছেন। তিনি তার পররাষ্ট্র নীতি বাস্তবায়ন সবেমাত্র শুরু করেছেন- শান্তি প্রতিষ্ঠায় এটি আদতে কোনো দীর্ঘমেয়াদী অবদান রাখতে পেরেছে কি না, তা প্রমাণ করা তো দূরের কথা! ফলে পুরস্কার পেয়ে সম্ভবত ওবামা নিজেও বেশ অবাক হয়েছিলেন।
মার্কিন যুদ্ধবিরোধী অ্যাক্টিভিস্ট ব্রায়ান বেকার বিষয়টি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বলেন, জর্জ ডব্লিউ বুশ না হওয়ার পুরস্কার হিসেবেই ওবামা এই নোবেলটি পেয়েছিলেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণে কাজ করার জন্য ২০০৭ সালে আল গোর যৌথভাবে পুরস্কারটি পেয়েছিলেন। তবে গোর অন্তত অর্ধেক পুরস্কার পেয়েছিলেন, অথচ ওবামাকে স্রেফ কিছু প্রত্যাশার ওপর ভিত্তি করেই পুরো নোবেলটি দিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ট্রাম্প দারুণ এক উৎসাহ নিয়ে এই বিষয়ে লেগে আছেন। তিনি সম্ভবত বিশ্বাস করেন, তার কূটনৈতিক সাফল্য ও ঝানু ব্যবসায়ীসুলভ দরকষাকষির ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত নোবেল কমিটিকে রাজি করাতে পারবে। কিন্তু তিনি এই প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃতি বুঝতে ভুল করেছেন।
পুরস্কারজয়ীদের আরো গভীরভাবে লক্ষ্য করলে আরেকটি মজার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আর তা হলো- যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনৈতিক আদর্শের প্রভাব।
যে চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন, তারা সবাই ছিলেন ডেমোক্র্যাট। আল গোরও একই দলের। অন্যদিকে, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারী ও অন্যান্য মানবাধিকার কর্মীদের নামও নোবেলের তালিকায় প্রাধান্য পেয়েছে। এই বিষয়গুলো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের পছন্দের ব্যবসায়িক ও রক্ষণশীল নীতির চেয়ে মার্কিন উদারতাবাদীদের কাছে বেশি সমাদৃত হয়েছে।
আর এটি দেখলেই বোঝা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন প্রথম রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে এতোটা মরিয়া।
ট্রাম্প দারুণ এক উৎসাহ নিয়ে এই বিষয়ে লেগে আছেন। তিনি সম্ভবত বিশ্বাস করেন, তার কূটনৈতিক সাফল্য ও ঝানু ব্যবসায়ীসুলভ দরকষাকষির ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত নোবেল কমিটিকে রাজি করাতে পারবে। কিন্তু তিনি এই প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃতি বুঝতে ভুল করেছেন।
আমেরিকান নীতি-নির্ধারক মহল কেবল কিছু কর্মকর্তার সমাহার নয়, যাদের দর কষাকষি করে মানিয়ে নেওয়া যাবে। তাদের উদারপন্থি চিন্তাভাবনা সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকারি দপ্তর এবং বিভিন্ন পেশাদার শ্রেণির গভীরে শিকড় গেড়ে আছে।
সরকার পরিবর্তনের পরও এই নেটওয়ার্কগুলো টিকে থাকে, কারণ রাজনৈতিক নিয়োগের চেয়েও তাদের পারস্পরিক দলীয় বিশ্বাসগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। নোবেল কমিটিও প্রায় একই ধরনের মানসিকতার পরিবেশে কাজ করে। তাদের সদস্যদের ওয়াশিংটনের কোনো নির্দেশ বা টাকাভর্তি খামের প্রয়োজন হয় না; তারা স্বাভাবিকভাবেই এমন লোকজনকে পছন্দ করেন যাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিজেদের সঙ্গে মেলে। অন্যদিকে ট্রাম্প ঠিক সেই সবকিছুকেই প্রতিনিধিত্ব করেন, যা এই গোষ্ঠীটি অপছন্দ করে।
গত বছর কমিটি তাকে উপেক্ষা করে ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী ও নিকোলাস মাদুরোর তীব্র সমালোচক মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে নোবেল পুরস্কার দেয়।
পরবর্তীতে মাচাদো দেখিয়েছিলেন যে, তিনিও রাজনৈতিক চাল বেশ ভালোই বোঝেন। এক নজিরবিহীন পদক্ষেপে তিনি তার মেডেলটি ট্রাম্পকে উপহার দেন।
আমি তখন থেকেই তার বুদ্ধি ও দূরদর্শিতার প্রশংসা করি। তার রাজনীতি নিয়ে যা-ই ভাবা হোক না কেন, এটি ছিল একটি চমৎকার ও নাটকীয় পদক্ষেপ- যেখানে ব্যক্তিগত উদারতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
ট্রাম্প স্বাভাবিকভাবেই পদকটি গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে তার প্রশাসন মাদুরোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। এতে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে বদলে গেলেও সেখানকার মানবাধিকার কর্মীদের প্রভাব অনেকটাই কমে যায়।
তবে একটি মেডেল স্রেফ একটি মেডেলই, আসল সম্মানটি এভাবে অন্যকে হস্তান্তর করা যায় না। ফলে ট্রাম্প এখনো প্রথম রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি এবং আমার মনে হয় না তিনি কখনো তা পাবেন।
চলতি বছর, হয়তো আগের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কমিটি একজন নিরাপদ প্রার্থীকে বেছে নিয়েছে। তিনি হলেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী ও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সাবেক হাইকমিশনার নাভানেথেম পিলে।
পিলে এমন একটি ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত যা নোবেল কমিটি ঐতিহ্যগতভাবে পছন্দ করে- অর্থাৎ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
চলতি বছর, হয়তো আগের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কমিটি একজন নিরাপদ প্রার্থীকে বেছে নিয়েছে। তিনি হলেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী ও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সাবেক হাইকমিশনার নাভানেথেম পিলে।
সেই দিক থেকে দেখলে, তিনি একটি আদর্শ পছন্দ। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, পেশাগতভাবে দক্ষ এবং এমন সব বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত যা পশ্চিমা লিবারেল সমাজ বেশ সমর্থন করে।
তার ক্যারিয়ারও অবশ্য বিতর্কমুক্ত ছিল না। দক্ষিণ আফ্রিকার সমালোচকেরা তার পশ্চিমা যোগসাজশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, আবার ফিলিস্তিন বিষয়ে তার অবস্থান ইসরায়েলে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে।
তা সত্ত্বেও পিলে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব যার সাফল্য স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। আগের কিছু নোবেল বিজয়ীদের মতো তাকে অচেনা লোক বলা যাবে না, কিংবা স্রেফ আলোচনার তুঙ্গে থাকার জন্য তিনি পুরস্কার পেয়েছেন- এমন অভিযোগও করা যাবে না।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, তিনি এমন একজন সমঝোতামূলক প্রার্থী, যা নোবেল শান্তি পুরস্কারের ভাবমূর্তি রক্ষায় এই মুহূর্তে খুব দরকার ছিল। কয়েক দশক ধরেই এই প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা কমছিল, তবে এ বছরের সিদ্ধান্তটি হয়তো ইঙ্গিত দেয় যে বিশ্বসেরা এই শান্তি পুরস্কারটিকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার বানানোর বিপদ সম্পর্কে কমিটি অবশেষে সচেতন হতে শুরু করেছে।
অন্তত সাময়িকভাবে হলেও, এই সম্মাননার পতন হয়তো ঠেকানো গেছে।
লেখক: নিকোলাই গ্যাস্তেলো হলেন রাশিয়ার একজন রাজনৈতিক কৌশলবিদ ও লেখক
ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: মনিরুল হক ফিরোজ
